সরবরাহ থাকার পরেও চড়া দাম এলাচের, কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ

0

মিথিল ঠাকুরের বাবা অনিল ঠাকুর সবাইকে ছেড়ে গত হয়েছেন ২৫ সেপ্টেম্বর। দুর্গোৎসব শুরু হয়েছে বলে ঠিক করেছেন দেবী মায়ের অঞ্জলির পর পরই করবেন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান। হাজার খানেক আমন্ত্রিত অতিথিদের অতিথিয়তার জন্য খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করার জন্য আগে থেকেই মশলার বাজারে ডুঁ মারতে এসে ভড়কে গেলেন। রীতিমতো গরম মশলাপাড়ায়।

সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরেও পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে বেড়েই চলেছে এলাচের দাম। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন এলাচের ফসল শেষের পথে হওয়ায় নতুন ফসল না আসা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবেই বাড়ছে এলাচের দাম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এলাচের দাম চড়া থাকে। মূলত বিয়ে, মেজবান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করেও হঠাৎ বাড়িয়ে দেয় দাম। খাবারের অতিরিক্ত চাহিদাকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। ফলে বাড়তে থাকে এলাচের মূল্য।

এদিকে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরেও দামের এমন উঠানামার চিত্র অস্থির করে চলেছে এলাচের বাজার। বছরজুড়ে কোনো না কোনো উপলক্ষে এলাচের চাহিদা থাকে। বেশ কয়েকমাস ধরে অস্থির এলাচের বাজার। তাই কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। তাছাড়া বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে দরবৃদ্ধির এ প্রবণতা অব্যাহত থাকে।

এদিকে ব্যবসায়ীরাও বাজারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বৃদ্ধি করেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রেক্ষাপট দেখিয়ে কোনো কোনো আমদানিকারক ব্যয় বেড়েছে বলে দাম বাড়তি করেন।

তবে আমদানিকারকদের দাবি, ভারতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়ে যায়। যার কারণে এলাচের বড় রপ্তানিকারক দেশ গুয়েতেমালার ওপর চাপ পড়ে। ভারতের বাজারে এলাচের দাম ৩ হাজার ৪০০ রুপিতে ঠেকেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলাচের দাম বাড়ায় এর প্রভাব ফেলছে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে।

আড়তদাররা জানান, খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে কয়েকদিন আগেও এলাচ কেজি প্রতি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৮০ টাকায়। এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৩০ টাকায়। অথচ গত এক মাস আগেও সেই এলাচ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৮০ টাকায়। শুধুমাত্র উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাচের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩৫০ টাকা!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাতুনগঞ্জের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ‌‘এলাচের সরবরাহ স্বাভাবিক। তারপরও বছরের এই সময়ে এলাচের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। অক্টোবরে গুয়েতেমালায় প্রথম ধাপে যে ফসল উঠেছিল সেসব ফসল ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে গেছে। সাধারণত এলাচ স্লো আইটেম। তাই দেশে যখন চাহিদা বাড়ে ব্যবসায়ীরা তখন সংকটের কথা বলে এলাচের বাজার বাড়িয়ে নেন। খাতুনগঞ্জের পাঁচজন বড় মসলা আমদানিকারক সিন্ডিকেট করে এলাচের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন। মূলত কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানিকারকরা এলাচের দাম বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।

মশলা ব্যবসায়ী হরিপ্রকাশ বলেন, ‘খাতুনগঞ্জে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী এলাচ আমদানি করেন। মূলত পুরো বাজারটাই ওরা নিয়ন্ত্রণ করেন। বাজারের অবস্থা বুঝে আমদানিকারকরা দাম উঠানামা করায়। এক্ষেত্রে আবার ট্রেডাররাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন। একটন এলাচের মূল্য ২০ লক্ষ ৮০ হাজার কিন্তু কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২৪ লক্ষ ৩০ টাকায়।

পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, ‘মসলার দাম ওঠানামা করে বুকিং ফি’র ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে মসলার দাম বাড়লে এখানেও মসলার দাম বাড়ে। মসলাপণ্যে সাধারণত কোনো রকমের সিন্ডিকেট হয় না। মসলা আইটেম যে যার মতো করে আমদানি করে বিক্রি করেন। আর এই পণ্যগুলোর দাম ওঠানামা করে। এখন এমনিতেই এলাচের নতুন ফসল আসবে। তখন কমে যাবে।

খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক গুলিস্তান ফিডের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে এলাচের ফসল শেষের পথে। অক্টোবরে নতুন ফসল আসবে। আর বাজারে আসতেও সময় নিবে মাস দুয়েক। তাই যাদের কাছে এলাচ মজুদ আছে এগুলো মূলত ট্রেডিং হচ্ছে।

খাতুনগঞ্জের এলাচ আমদানিকারকরা বলেন, ‘সাধারণত গুয়েতেমালায় সেপ্টেম্বরে এলাচের ফসল উঠে। গুয়েতেমালা থেকে এলাচ আসতে ২ মাস সময় লাগে। তাই বছরের এ সময়ের দিকে এলাচের মজুদ কমে যায়। মজুদ কমে যাওয়ায় বাজারে এলাচের সংকট দেখা দেয়। এছাড়া বছরের শেষের দিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরিমাণ বাড়ে। তাই বেড়ে যায় এলাচের চাহিদা। তবে নতুন এলাচ আমদানি হলে দাম অর্ধেকে নেমে যাবে।

খাতুনগঞ্জের অপর আমদানিকারক আবু মোহাম্মদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভারতের এলাচের বাজার অনেক গরম। ৩ হাজার ৪০০ রুপির উপরে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া এসময় এলাচের ফসল শেষ হয়ে যায়। নতুন ফসল এলে দাম পড়বে।

কৃত্রিম সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম সংকটের বিষয়টি সত্য নয়। কারণ বাজারে যখন যোগানের চেয়ে চাহিদা বেড়ে যায় তখন অর্থনীতির নিয়মেই দাম বেড়ে যায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে এলাচের বুকিং রেটও দ্বিগুণ বেড়ে যায়। যার প্রভাব পড়েছে এলাচের বাজারে।’

খুচরা ব্যবসায়ী রহমান শেখ বলেন, ‘এমনিতেই বছরের শেষদিকে মসলার যথেষ্ট চাহিদা থাকে। পাইকারিতে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও দাম বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বৃদ্ধি ও আমদানি নির্ভরতার কারণে আমদানিকারকদের কারসাজিতে এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির কারণে মসলা সংরক্ষণেও বেশ সতর্ক থাকতে হয়।

এএইচ

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন