s alam cement
আক্রান্ত
৩৫১০৮
সুস্থ
৩২২৫০
মৃত্যু
৩৭১

সম্প্রীতি বুননে নতুন প্ল্যাটফরম চট্টগ্রামে— ‘দি নেটওয়ার্ক ফর পিসমেকার্স’

দুদিনের প্রশিক্ষক কর্মশালা সম্পন্ন

0

‘বিভাজনের রাজনীতি, অপরিমিত জীবনাচার, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং বিশেষ করে অর্থনৈতিকসহ নানা বৈষম্য সামাজিক সম্প্রীতির বীজতলা নষ্ট করছে। এসব বৈষম্যের পথ বন্ধ করা গেলে সমাজে সম্প্রীতির পথ খুলবে।’

‘কালটিভেশন অফ সেক্যুলার মাইনড’ অর্থাৎ ‘সম্প্রীতি বুনন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষকদের কর্মশালায় উপরোক্ত অভিমত ব্যক্ত করা হয়। ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার ও শনিবার) চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির আর্ট গ্যালারি হলে দু’দিনব্যাপী এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। একটি সহনশীল ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কর্মশালা থেকে ‘দি নেটওয়ার্ক ফর পিসমেকার্স, চট্টগ্রাম’ নামে একটি প্ল্যাটফরম’ গঠন করা হয়।

কর্মশালায় রিসোর্সপারসন হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী, চবি চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক প্রফেসর মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, চবি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক প্রফেসর মনজুরুল আলম, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুভাষ দে ও চবি নাট্যকলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব অসীম দাশ।

‘সম্প্রীতি বুনন’ শীর্ষক প্রকল্পের নেতৃত্বদানকারী চবি দর্শন বিভাগের শিক্ষক মাছুম আহমেদ কর্মশালায় ধারণাপত্র তুলে ধরেন। তিনি মানবিক মূল্যবোধ, স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। প্রকল্পের পরিচালক শান্তিকর্মী সনৎ কুমার বড়ুয়া ও শাসন বড়ুয়া কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন। কর্মশালায় আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বিষয়ে প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত নানা কর্মকাণ্ডের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়।

কর্মশালায় প্রফেসর ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী তাঁর ‘পাওয়ার পলিটিক্স ও কমিউনাল হারমনি’ শীর্ষক আলোচনায় বলেন, ‘নানা ধর্ম, বর্ণ তথা সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানই সমাজের সৌন্দর্য। এতে হানাহানির অবকাশ নেই। সংঘাত আর বিদ্বেষের কারণ সম্প্রদায় নয়, বরং সাম্প্রদায়িক আচরণ।’

Din Mohammed Convention Hall

সম্প্রীতি বুননে নতুন প্ল্যাটফরম চট্টগ্রামে— ‘দি নেটওয়ার্ক ফর পিসমেকার্স’ 1

তিনি বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বারবার আঘাত হেনেছে অপরাজনীতি। তিনি ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি, ‘পার্টিশন অফ বেঙ্গল’ রাজনীতি, ‘কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড’ সহ অপরাজনীতির নানা উপাদান কীভাবে আমাদের সমাজের আবহমানকাল থেকে চলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাগান তছনছ করেছে তা তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে তিনি অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শকে সম্প্রীতির সোপান নামে অভিহিত করেন।

প্রফেসর মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন তাঁর ‘এসথেটিকস অ্যান্ড হারমনি’ শীর্ষক আলোচনায় মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে শান্তির বারতা হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি শিল্পকলা তথা চারুকলার প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি তুলে ধরে বলেন, অন্তরের সৌন্দর্যকেই সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার বাহন করতে হবে। সুন্দরের অনুশীলনই মানুষকে শান্তির পথ দেখাতে পারে।

প্রফেসর মনজুরুল আলম তাঁর ‘সেক্যুলার ভোকেবুলারি’ শীর্ষক আলোচনায় উপস্থাপন করেন কীভাবে একটি নির্দোষ শব্দকে আমরা কলুষিত করে তুলি। তিনি ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বলেন, নিজেকে সেরা বলে জাহির করার মধ্যে এক ধরনের অসহায়ত্ব লেপ্টে থাকে। সেই অসহায়ত্ব সমাজে বিদ্বেষ আর বিভাজনকে উস্কে দেয়। শব্দ চয়নে ও প্রয়োগে মানবিক মূলবোধ সংযুক্ত থাকলে সম্প্রীতি ও শান্তির পথ অবারিত হয়।

সাংবাদিক সুভাষ দে তাঁর ‘সিড অফ কমিউনাল হারমনি’ শীর্ষক আলোচনায় সমসাময়িক সামাজিক অস্থিরতার কারণ বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, সম্প্রীতি ভাবনার বীজতলা হচ্ছে মানুষের মানসভূমি। এই ভূমিতে কর্ষণ সঠিকভাবে হলে ‘সম্প্রীতির বুনন’ শক্তিশালী হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, বিভাজনের রাজনীতি, পরিমিত জীবনবোধের শূন্যতা, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই তথা বৈষম্য সমাজে সম্প্রীতির বীজতলাকে বিনিষ্ট করছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি পারিবারিক শিষ্টাচার, পিতা-মাতার নৈতিক জীবনাচার, পঠন-পাঠনে বৈচিত্র আনায়ন, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বিস্তৃতি তথা লোকসংস্কৃতি চর্চার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এক্ষেত্রে তিনি সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আহবান জানান।

প্রফেসর অসীম দাশ তাঁর ‘মেডিটেশন অ্যান্ড হারমনি’ শীর্ষক উপস্থাপনায় ব্যক্তির আত্মসত্তার পরিশোধনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, নিঃশ্বাসের সঙ্গে অন্তরের কলুষিত উপাদান পরিত্যাগ করে সুখ, সম্প্রীতি, ভালোবাসার উপাদানকে গ্রহণ করতে হবে। আত্মসত্তার উন্নতি করা গেলে একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রেমময় সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। কর্মশালায় তিনি মেডিটেশন অনুশীলন করান এবং করোনা মহামারিতে শিক্ষার্থীদের অভিঘাত মোচনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর তাদেরকে মেডিটেশন অনুশীলনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানান।

সর্বজনীন প্রার্থনার মধ্য দিয়ে প্রতিদিনের কর্মসূচি শুরু হয়। শান্তিকর্মী মুক্তা চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় কর্মশালায় সম্প্রীতিমূলক সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রকল্পের গবেষণা সহকারী প্রার্থী ঘোষ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী ও সাংবাদিক ফারুক তাহের।

কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী তথা শান্তিকর্মীসহ প্রায় ৩৫ জন তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। তাঁরা প্রত্যেকেই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বিনির্মাণে পারিবারিক শিষ্ঠাচার, পরমত সহিষ্ণু আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দপূর্ণ আচরণ, স্কুল পর্যায়ে সব ধর্মের সমন্বয়মূলক পাঠদান এবং পাঠদানে শিক্ষকদের ইতিবাচক ও উদার মনোভাবের ওপর সমধিক গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা সম্প্রীতি ও সহনশীল সমাজের জন্য নিজেদের নিবেদন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নেটওয়ার্ক ফর রেলিজিয়াস অ্যান্ড ট্র্যাডিশনাল পিসমেকার্সসহ কয়েকটি সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় ‘সম্প্রীতি বুনন’ শীর্ষক গবেষণা প্রকল্পটি চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন হচ্ছে।

ManaratResponsive

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন
ksrm