সম্পদের পাহাড় কর্ণফুলী গ্যাসের এক উপব্যবস্থাপকের, ডেকে বক্তব্য নিলো দুদক

‘ভুয়া ক্লিয়ারেন্স’ পদোন্নতির অভিযোগ

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) উপব্যবস্থাপক মো. গোলাম শাহজাহানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি তার বক্তব্যও নিয়েছে দুদক। তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অবৈধভাবে পদোন্নতি নেওয়া, অবৈধ টাকায় সম্পদ অর্জন ও গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে।

চলতি বছরের ৩১ জুলাই কেজিডিসিএলের উপব্যবস্থাপক মো. গোলাম শাহজাহান ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. মোজাহার আলীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে নানা অপকর্ম ও ঘুষ বাণিজ্য করে ৪৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান করছে দুদক। গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণ করেছে দুদক জেলা সমন্বিত, চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক জুয়েল মজুমদার।

জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে এই কর্মকর্তার পদোন্নতি অবৈধ বলে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সাবেক দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন।

অভিযোগ রয়েছে, কেজিডিসিএলের সাবেক মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) ফিরোজ আলমের সঙ্গে যোগসাজশে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন শাহজাহান। গ্রাহককে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও পুনঃসংযোগ দিয়ে বাণিজ্য করে হাতিয়ে নেন বিপুল পরিমাণের অবৈধ অর্থ। এসব অর্থে চট্টগ্রামের একাধিক ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে জায়গা কিনেছেন তিনি।

এছাড়া প্রায় বছর খানেক আগে মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোজাহার আলীর মদদে ফৌজদারহাট গ্যাস অফিস থেকে কেজিডিসিএলের ষোলশহর দপ্তরে বদলি হয়ে আসেন গোলাম শাহজাহান। এরপর নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য, মহাব্যবস্থাপক খাইরুল হাসানের দপ্তরে ভেতরে অতর্কিত হামলা ও হুমকি দেন তিনি। এসব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন টাকার জোরে তিনি ধামাচাপা দেন তিনি। একইসঙ্গে তার অবৈধ আয়ের একটা ভাগ মোজাহার আলীর পকেটেও যায় বলেও অভিযোগ ওঠে।

গোলাম শাহজাহানের যত সম্পদ

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার দুই নম্বর আল-ফালাহ গলিতে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপার কোম্পানি থেকে এক কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট কেনেন শাহজাহান। ২০১৫ সালে কেনা মুরাদপুর মেয়র গলির ভেতরে ১৮০০ বর্গফুটের আরও একটি দেড় কোটি টাকার মূল্যের ফ্ল্যাট রয়েছে তার। ২০১৭ সালের তার নিজ বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে কিনেছেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকার মূল্যের এক একর জায়গা। রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ১৮ কাটা জায়গা।

এছাড়া তার স্ত্রীর ও শ্যালকের নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ রয়েছে বলেও দুদকে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

যেভাবে নিয়োগ, পদোন্নতি নেন শাহজাহান

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১১ ডিসেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা পাশ না করে, জালিয়াতির মাধ্যমে নথিপত্র ছাড়াই সহকারী ব্যবস্থাপক পদে ৩৭ জন নিয়োগ পেয়েছিলেন কেজিডিসিএলে। ২০২০ সালের ২০ আগস্ট দুদকের ‘ভুয়া ক্লিয়ারেন্স’ দেখিয়ে ওই ৩৭ জন কর্মকর্তাকে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ওই নিয়োগের তালিকায় নাম রয়েছে বর্তমান উপব্যব্যবস্থাপক মো. গোলাম শাহজাহানের। দুদকের তদন্তে ওই ৩৭ কর্মকর্তার নিয়োগ ও পদোন্নতির দুটি ভুয়া বলে দুদক কমিশন বরাবরে প্রতিবেদন দাখিল করেন দুদকের সাবেক কর্মকর্তা মো. শরীফ উদ্দিন।

শাহজাহানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) খাইরুল হাসানের অফিসে হামলা চালিয়ে হত্যার হুমকি দেন গোলাম শাহজাহান। ওই বছরের ৬ নভেম্বর তাকে শোকজ করে নোটিশও দেয় কেজিডিসিএলের প্রশাসন বিভাগ। ১২ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে অনিয়ম এবং দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ জমা পড়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব, কেডিসিএলের বোর্ড চেয়ারম্যান মো. মাহবুব হোসেনের কাছে।

জানা গেছে, বর্তমানে মো. গোলাম শাহজাহান কেজিডিসিএলর অফিস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক। এতো অভিযোগ থাকার পরও এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন এই কর্মকর্তা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে কেজিডিসিএলের উপব্যবস্থাপক মো. গোলাম শাহজাহান ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. মোজাহার আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে সংযোগ মেলেনি। পরে দুজনকে এসএমএস পাঠিয়েও কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক কর্মকর্তা জুয়েল মজুমদার চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তাদের দপ্তরে ডেকে বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান চলমান থাকায় এই মুহূর্তে কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!