চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের সিটে ও মেঝেতে চিকিৎসাধীন অবস্থা রয়েছে সারি সারি শিশু। সিট অপ্রতুল হওয়া পুরো ওয়ার্ডে ঠাসাঠাসি অবস্থা। আর এসব শিশুদের নিয়ে বসে আছেন মায়েরা। এদের অনেকের শরীরে ক্লান্তি ছাপ, নাওয়া-খাওয়া ভুলে তাদের চিন্তা শুধুই সন্তানকে নিয়ে। এ যেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা সন্তানের প্রাণ বাঁচানোর অসম লড়াই।

মায়েদের নিঃসঙ্গ এই যুদ্ধের গল্প হয়তো কোথাও লেখা থাকে না, ভেসে ওঠে না কোনো টাইমলাইনে। তবুও থেমে থাকেন না তারা। কারণ সন্তান যে মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন।
৯ মে সরেজমিনে চট্টগ্রাম মেডিকেলের শিশু ও হাম ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের বেডে সন্তানকে নিয়ে অসহায়ভাবে বসে আছেন অনেক মা। কেউ বেড না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আবার কেউ মেঝেতে বসেই চালিয়ে যাচ্ছেন সন্তানের চিকিৎসা। প্রতিদিনই এমন দৃশ্যের সাক্ষী এই হাসপাতাল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাম, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। রোগীর চাপ বাড়ায় দেখা দিয়েছে বেড সংকট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশুর অভিভাবকরা। গত দুই মাসে প্রায় ১৬০ জন শিশু হাম, হাম উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
তবে এ লড়াই সবাই জিততে পারেন না, নিয়তির কাছে হার মানতে হয় অনেক মায়েদের। তেমনই এক মা রিংকু শীল। তার পাঁচ মাস বয়সী শিশু দেবরাজ হাম আক্রান্ত হয়ে ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে। চেষ্টা কোনো কমতি রাখেননি রিংকু শীল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরে যান তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে দেবরাজ।
ছেলের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে রিংকু শীল জানান, প্রায় চার মাস ধরে অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছেন তিনি। আগে থেকেই নানা রোগে আক্রান্ত ছিল শিশুটি। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেলে এসে ধরা পড়ে হাম। শুরু হয় আরেক দফা যুদ্ধ—কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। আমার সন্তানকে বাঁচাতে পারলাম না।
এমন গল্প শুধু একজন মায়ের নয়। হাসপাতালের প্রতিটি বেডে, প্রতিটি করিডরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মায়ের অজানা লড়াইয়ের গল্প।
তাই হয়তো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘মা’ কবিতায় বলেছেন—যখন জনম নিনু/কত অসহায় ছিনু/ কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম কোনো কিছু/ওঠা বসা দূরে যাক/মুখে নাহি ছিল বাক/চাহনি ফিরিত শুধু মা-র পিছু পিছু!
বিশ্ব মা দিবসের এইদিনেও অবুঝ সন্তানকে বুকে আগলে নীরবে লড়ে যাচ্ছে মায়েরা। এই মায়েরাই হচ্ছেন আমাদের ‘সর্বজয়া’।
ডিজে




