সদরঘাটে ৯ বছর ধরে রেল শ্রমিক লীগ কর্মীর দখলে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, মালিকের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা

চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাটে ৯ বছর ধরে কোটি টাকার ফ্ল্যাট দখল করে আছেন এক রেলওয়ে শ্রমিক লীগ কর্মী। কোনো ভাড়ার টাকা না দিয়ে উল্টো ফ্ল্যাট মালিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছেন তিনি। আওয়ামী সরকারের আমল থেকে তার দেখানো দাপট এখন চলছে। ৫ আগস্টের পর ছাত্র আন্দোলনে হামলার মামলার আসামি হয়েও তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। বরং তার ক্ষমতার যেন আরও বেড়ে গেছে। একইসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনেও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ওয়ালী উল্লাহ সুমন। তিনি সিআরবির প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তরে (সিসিএম) এসিআই পদে কর্মরত রয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি রেল শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে সদরঘাট থানার ৭১ মাঝির ঘাটের ‘এফ জি মাদার ভিলা’র ছয় তলার ‘ই’-ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন সুমন। এরপর থেকে তিনি রেল শ্রমিক লীগের কর্মী হিসেবে দাপট দেখাতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেন। তার সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার কথা বলেও কোনো কাজ না হওয়ায় ২০২৩ সালে ফ্ল্যাটমালিক তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে উল্টো ৩০ লাখ টাকা পাবেন উল্লেখ করে ফ্ল্যাটমালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন সুমন।ওই মামলার পর থেকে ফ্ল্যাটমালিক এলাকায় থাকতে না পারলেও বহাল তবিয়তে আছেন শ্রমিক লীগের এই কর্মী।

এরপর প্রতিকার না পেয়ে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ, প্রতিকার আইন-২০২৩ অনুযায়ী আরেকটি মামলা করেন ফ্ল্যাটমালিক। ওই মামলা তদন্ত শেষে চলতি বছরের ২২ মে শ্রমিক লীগ কর্মী সুমনকে অবৈধ দখলদার উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা। এছাড়া আগের মামলাটিতেও সুমনকে আসামি হিসেবে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী ফ্ল্যাটমালিক সাতকানিয়ার বাসিন্দা আব্দুল মান্নান জানান, ২০১৭ সালে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ঘরভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেন। তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের একটি মামলা করি আমি। এরপর সে উল্টো আমার বিরুদ্ধে মামলা করে দেয়। এরপর আমি ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভূমি অপরাধ প্রতিকার আইনে আরেকটি মামলা করি। কিন্তু এখনও সে আমার ফ্ল্যাট দখল করে আছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদরঘাট থানার এসআই শাহাদাত হোসেন জানান, ভূমি অপরাধ প্রতিকার আইনে করা ওই মামলার প্রতিবেদন ২২ মে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে সুমন যে ফ্ল্যাট দখল করে আছেন, তার প্রমাণ মিলেছে।

এ বিষয়ে জানতে প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (পূর্ব) সুজিত কুমার সাহার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জানান, বিষয়টি ন্যাক্কারজনক। আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এক্ষুণি বলে দিচ্ছি।

এর আগে ৯ জুন রাত ৯টায় চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন কলোনিতে মহানগর প্রভাতী ট্রেনের এটেনডেন্ট হেলালের ঘরে ঢুকে নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন ওয়ালী উল্লাহ সুমন।

ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, মঙ্গলবার রাত ৯টায় পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে হেলালের ঘরে আসেন ওয়ালী উল্লাহ সুমন। কিন্তু এসেই কাউকে কিছু না বলে মাদকসেবন শুরু করেন তিনি। এ সময় বাধা দিলে তিনি ঘরের নারীদের সঙ্গেও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করেন। পরে ভুক্তভোগীর পরিবার কোতোয়ালী থানায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন।

এ ঘটনায় চট্টগ্রাম প্রতিদিনের নিউজ পোর্টালে ‘নারীর সঙ্গে অশালীন আচরণ, রেল শ্রমিক লীগ কর্মীকে আটকের পর ছিনিয়ে নিলো অনুসারীরা’—শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সংবাদ প্রকাশের পর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ওয়ালী উল্লাহ সুমন। ১৬ জুন তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সিনিয়র নিজস্ব প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর শুভর মুঠোফোনে ০১৮১৮-৮৮০২০০ নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি ও গালিগালাজ করেন। একইসঙ্গে তিনি প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে ‘নিউজ কেন করেছেন’ কৈফিয়ত চান৷ প্রতিবেদককে তিনি পেটানোর হুমকি দেন এবং গালিগালাজ করেন। একইসঙ্গে ‘কোর্টে দেখা হবে’ বলেও ম্যাসেজ দেন।

৫ আগস্ট-পরবর্তী ছাত্র আন্দোলনে হামলার দুটি মামলায় আসামি সুমন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি কমিশনে (দুদক) একটি মামলা রয়েছে।

ডিজে

ksrm