সংসদে কথা বলার সময় সাধারণত কম পড়ে যায় যুক্তি-তর্কে। তবে এবার চট্টগ্রামের পটিয়ার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক এনামের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটল। মূল বক্তব্যে ঢোকার আগেই ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানাতে জানাতেই শেষ হয়ে গেল তার নির্ধারিত সময়।
বৃহস্পতিবার (২ মার্চ) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর সংশোধনী নিয়ে আলোচনার সময় এ ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের এই সংসদ সদস্য বক্তব্য শুরু করেন ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ বলে। এরপর তিনি স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে ধন্যবাদ জানান এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন সংসদে কথা বলার সুযোগ পাওয়ায়। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তার ‘প্রিয় নেত্রী’ দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে।
এরপর তিনি বলেন, তাকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য তিনি তার নেতা ও সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) এলাকার সর্বস্তরের জনগণের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান। এ সময় তিনি গাইবান্ধা-৪ আসনের একজন সংসদ সদস্যের প্রসঙ্গ তুলতে শুরু করেন। ঠিক তখনই তার নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায় এবং স্পিকার তার মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেন। ফলে সংশোধনী প্রস্তাবটি আর উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মোস্তফা জাফর হায়দার নামে একজন মন্তব্য করেন, এমপি প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতে যেন এমন কেউ নির্বাচিত না হন, যিনি সংসদে কেবল ধন্যবাদ জানাতেই সময় শেষ করে ফেলেন। সায়েম হোসেন নামে আরেকজন লেখেন, ‘এদের জন্যই তেলের পাম্পে তেল নেই।’ অন্য এক পাঠক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এরা জনগণের টাকায় চলা সংসদকে তামাশার জায়গায় পরিণত করেছে।’
আগে থেকেই বিতর্কিত
এদিকে এনামুল হক এনামকে ঘিরে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। এস আলম গ্রুপের গাড়ি সরানোর একটি ঘটনায় তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, পরে তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন পান তিনি। তবে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তার মনোনয়ন নিয়ে আপত্তি জানায় এবং অভিযোগ তোলে, চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগ্রুপ এস আলমের তদবিরেই তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ২৯ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট এলাকায় মীর গ্রুপের একটি ওয়্যারহাউস থেকে ১৪টি বিলাসবহুল গাড়ি একে একে বের করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, এসব গাড়ি গোপনে সরিয়ে নেওয়ার কাজ তদারকি করছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম এবং কর্ণফুলী উপজেলা বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক এসএম মামুন মিয়া।
এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের মেয়ের শ্বশুর এবং মীর গ্রুপের মালিক আবদুস সালামের সঙ্গে এনামুল হক এনামের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। এই সূত্রে তাকে এস আলমের বেয়াই হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়। ঘটনার দুই দিন পর বিএনপি আবু সুফিয়ান ও এনামসহ তিন নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরদিন ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয় এবং তাদের প্রাথমিক সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। তবে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর সতর্কবার্তা দিয়ে তাদের দলীয় সদস্যপদ পুনর্বহাল করা হয়। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ধারণা, এস আলমের তদবিরেই তারা দলে ফিরে আসেন এবং পরবর্তীতে মনোনয়নও পান।
সিপি




