ভোটে জয়ী হলেও ঋণখেলাপির অভিযোগে উচ্চ আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর সেই বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. নাজিবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, একজন ব্যক্তির প্রার্থিতা ঋণখেলাপির দায়ে বাতিল হওয়ার পর এখন তাঁকে ঋণখেলাপি বলা যাবে কি না। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে না।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দিতে গিয়ে মো. নাজিবুর রহমান কয়েক দিন আগের সংসদীয় বিতর্কের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে একজন সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সংসদে কোনো ঋণখেলাপি আছেন কি না। তখন স্পিকার বিচারাধীন বিষয় উল্লেখ করে মন্তব্য করতে পারেননি। এখন একজন ব্যক্তির প্রার্থিতা ঋণখেলাপির দায়ে বাতিল হয়েছে। তাই এখন তাঁকে ঋণখেলাপি বলা যাবে কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এর জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, এটি পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয় নয়। কোনো সদস্যের সদস্যপদ থাকবে কি না, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। আদালতের নির্দেশনার আলোকে নির্বাচন কমিশন আদেশ জারি করলে সংসদকে বিষয়টি জানানো হবে। তাই নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এরপর পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আগে সংসদে বলা হয়েছিল, এই সংসদে কোনো ঋণখেলাপি সদস্য নেই, তবে ঋণগ্রস্ত সদস্য থাকতে পারেন। তিনি বলেন, আদালত এ বিষয়ে রায় দিলেও আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে সংসদে আসেননি। তিনি সংসদ সদস্য নন; তাঁর প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল এবং উচ্চ আদালত সে বিষয়ে রায় দিয়েছেন। তাই এটি কোনো পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয় নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার বলেন, পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাঁর। তবে আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যা সঠিক।
এর আগে গত ১৮ জুন সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছিলেন, ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদে’ দাঁড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে। ওই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
ঋণখেলাপির দায়ে প্রার্থিতা বাতিল
মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ ঋণখেলাপির অভিযোগে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করেন। এর ফলে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ হারান। একই সঙ্গে নতুন করে ওই আসনে নির্বাচনের সম্ভাবনার কথাও জানান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
গত ১৫ জুন শুনানি শেষে আপিল বিভাগ মঙ্গলবার রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন। রায়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর করা আপিল মঞ্জুর করে আদালত আসলাম চৌধুরীকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেন।
আদালতে আসলাম চৌধুরীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির, আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, যায়েদ বিন আমজাদ এবং মো. আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী। ব্যাংক এশিয়া পিএলসির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম এবং যমুনা ব্যাংক পিএলসির পক্ষে ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবিরও শুনানিতে অংশ নেন।
আইনি লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন। পরে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে একই আসনের জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ও যমুনা ব্যাংক নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সেই আপিল খারিজ করলে তাঁর প্রার্থিতা বহাল থাকে।
পরে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক রিট করেন অভিযোগকারী দুই পক্ষ। গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট খারিজ করে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রাখেন। তবে ওই আদেশের বিরুদ্ধে আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন। একই সঙ্গে ব্যাংক এশিয়া পিএলসি ও যমুনা ব্যাংক পিএলসিও হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ আনোয়ার সিদ্দিকীর লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। আদেশে বলা হয়, আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করা হলেও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী অংশ নিতে পারবেন। তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্বাচিত হলেও সংশ্লিষ্ট আসনের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না।
নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী প্রায় ৫৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীকে পরাজিত করেন। কিন্তু আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ওই আসনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখে। ফলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারেননি।
পরে ফলাফল প্রকাশ ও শপথ গ্রহণের অনুমতি চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন আসলাম চৌধুরী। অন্যদিকে গত ৩১ মার্চ পৃথক আপিল করেন আনোয়ার সিদ্দিকী। ২৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আপিলটি নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।
শুনানির ধারাবাহিকতায় ১০ জুন আপিল বিভাগ অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীকে মতামত দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেন। তাঁরা শুনানিতে অংশ নিয়ে আদালতকে মতামত দেন।
রায় ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, চট্টগ্রাম-৪ আসনে নতুন করে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ওই আসনের ভোটাররা আবারও তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন।
সিপি




