শুরু হলো টেস্ট ক্রিকেটের বিশ্ব লড়াই

0

ওয়ানডে ক্রিকেটের পর টি-টোয়েন্টির রমরমায় অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে ক্রিকেটের বনেদী পরিবারের সদস্য ‘টেস্ট ক্রিকেট’। টি-টোয়েন্টির সাফল্যে এখন আবার দুনিয়াজুড়ে আয়োজন চলছে দশ ওভারের খেলা ‘টি-টেন’। ক্রিকেটের সবচেয়ে অভিজাত ও সুপ্রাচীন টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচানোর জন্য সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বর্তমানের অনেক খেলোয়াড়ও নানান পরামর্শ দেন আইসিসিকে। টেস্ট ক্রিকেট থেকে দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং টেস্ট খেলুড়ে দেশ ও খেলোয়াড়রাও অনেকটা আগ্রহহীন হয়ে পড়ায় শেষমেষ নড়েচড়ে বসে আইসিসি। বছরখানিক আগেই ঘোষণা দেয় টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন পরিকল্পনা নিবে আইসিসি। তখনই ঘোষণা আসে টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোকে নিয়ে আয়োজন করা হবে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। যেটি ২০১৯ সালে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০২১ সালের জুনে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার অ্যাশেজ সিরিজের প্রথম টেস্ট দিয়েই মাঠে গড়ালো আইসিসির সেই পরিকল্পনা-টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ

আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ কী?
প্রতি বছর এমনিতেই ১ এপ্রিল আইসিসি সারা বছরের পারফরম্যান্স এবং আগের বছরের পারফরম্যান্স হিসেব করে টেস্ট র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা দলকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু তারা এই সিস্টেমে না গিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই প্রতি দুই বছর পর পর টেস্টে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি।

এ সিদ্ধান্তের আলোকেই শুরু হয়েছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বা ডব্লিউটিসি)। এই চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্বের মৌসুমটা মূলতঃ শুরু হয়েছে ১৬ জুলাই থেকে। তবে ডব্লিউটিসি’র প্রথম টেস্ট মাঠে গড়ালো অ্যাশেজের মধ্য দিয়ে আজ (১ আগস্ট)থেকে। গ্রুপ পর্ব শেষ হবে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ। এরপর সেরা দুই দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিবে নয়টি দেশ। প্রত্যেকেই খেলবে কমপক্ষে তিনটি সিরিজ।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিবে নয়টি দেশ। প্রত্যেকেই খেলবে কমপক্ষে তিনটি করে সিরিজ।

কারা অংশ নেবে এই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে?
বর্তমানে আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশ হচ্ছে ১২টি। তবে এদের মধ্যে ডব্লিউটিসি’তে অংশ নেবে ৯টি দেশ। এরা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই ৯ দেশের মধ্যে আগামী দুই বছরে অনুষ্ঠিত হবে মোট ২৭টি সিরিজ।

কেন এই আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপকে আনা হলো?
অনেক আগে থেকেই আইসিসি টেস্ট ক্রিকেটে ভিন্ন কোনো মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। দ্বি-পাক্ষিক সিরিজগুলোকে ব্যবহার করেই টেস্টে ভিন্ন মাত্রা যোগ করার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। এমনিতেই তো প্রতি বছর ১ এপ্রিল র‌্যাংকিং পর্যালোচনা হয় এবং একটি দলকে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট দেয়া হয়।

গবেষণা করতে করতেই চলে আসে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ধারণা। ডব্লিউটিসি’র মাধ্যমে টেস্টে প্রতি দুই বছর পর পর একটি দল হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ক্রিকেটের অন্য দুই ফরম্যাচের মতই এটা হবে টেস্টের একটা বিশ্বকাপ। তবে, সেটা আয়োজনের জটিলতার কারণেই ২ বছর মেয়াদে চ্যাম্পিয়নশিপের ধারণা তৈরি করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে টেস্টে যেমন প্রতিদ্বন্দ্বীতা বাড়বে, তেমনি ভক্ত-সমর্থকদের মাঝেও তৈরি হবে আকর্ষণ। সিরিজের পর সিরিজ যখন পয়েন্টের নাড়াচাড়া হবে, কেউ উপরে আসবে, কেউ নিচে নামবে, কারা হচ্ছে সেরা- এসব যখন হিসাব-কিতাবের পর্যায়ে চলে আসবে, তখনই এ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হবে সমর্থকদের মধ্যে। তখন কে কার বিপক্ষে খেলছে, সেটা আর মাথায় থাকবে না ক্রিকেট ভক্তদের।

প্রতিটি দল কয়টি করে সিরিজে অংশ নেবে?
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ২৭ সিরিজের মধ্যে প্রতিটি দল হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে মোট তিনটি সিরিজ খেলবে। প্রতিটি সিরিজ কম করে দুই ম্যাচের কিংবা সর্বোচ্চ পাঁচ ম্যাচের হতে পারবে। তবে এই দুই বছরের সাইকেলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মধ্যে প্রতিটি দল প্রতি দলের বিপক্ষে কিন্তু খেলবে না। এই সময়ে মধ্যে দলগুলো ডব্লিউটিসি’র বাইরে একে অপরের বিপক্ষে খেলতে পারবে। যেমন, আগামী নভেম্বরে নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের মধ্যকার যে সিরিজ হবে, সেটা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভূক্ত থাকবে না। এ সিরিজ এফটিপির মধ্যে; কিন্তু ডব্লিউটিসি’র মধ্যে নয়।

তাহলে কোন সিরিজ ডব্লিউটিসি’র অন্তর্ভূক্ত?
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোই নির্ধারণ করবে, সংশ্লিষ্ট সিরিজটা ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভূক্ত হবে কি না। এরই মধ্যে পুরনো এফটিপির আন্ডারে থাকা কিছু সিরিজ নির্ধারণ হয়ে গেছে ডব্লিউটিসি’র অংশ হবে। প্রতিটি দলই এর মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে থাকা উপরের কিছু দলের বিপক্ষে এবং র‌্যাংকিংয়ের নিচের দলের বিপক্ষে খেলবে।

যেভাবে হবে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট বরাদ্ধ।

পয়েন্ট কিভবে ভাগ হবে?
পয়েন্ট ভাগাভাগিটাই অনেক জটিল। ক্রিকেট এমনিতেই জটিল হিসাব-নিকাশ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পয়েন্ট ভাগাভাগিও তেমনি জটিল বিষয়। ডব্লিউটিসি’র অধীনে যে সব সিরিজ অনুষ্ঠিত হবে, তার প্রতিটি সিরিজের জন্য পয়েন্ট হবে ১২০ করে। যেমন চলতি অ্যাশেজ সিরিজ হচ্ছে ডব্লিউটিসি’র অধীন। এখানে ম্যাচ ৫টি। প্রতিটি জয়ের জন্য পয়েন্ট ভাগ হবে ২৪ করে।

যদি ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ হয় (যেমন- শ্রীলঙ্কা-নিউজিল্যান্ড কিংবা ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ, যেগুলো সামনেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে) তাহলে সেখানে প্রতিটি জয়ের জন্য পয়েন্ট থাকবে ৬০ করে।

যদি ড্র হয়, তাহলে পয়েন্ট হবে জয়সূচক পয়েন্টের এক তৃতীয়াংশ। যেমন অ্যাশেজে ড্র হলে পয়েন্ট হবে ৮ করে। দুই ম্যাচের সিরিজে ড্র হলে পয়েন্ট হবে ২০ করে। আর যদি কোনো ম্যাচ টাই হয়ে যায়, তাহলে সেখানে পয়েন্ট ভাগাভাগি হবে জয়সূচক পয়েন্টের অর্ধেক করে।

পয়েন্ট টেবিলে আর কি আছে, যা জানা প্রয়োজন?
সম্প্রতি আইসিসি ঘোষণা করেছে, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও স্লো ওভার রেটের নিয়ম সংযুক্ত হবে। অর্থ্যাৎ টেস্টেও যদি স্লো ওভার রেটের জন্য কোনো দল দায়ী হয়, তাহলে প্রতি ওভারের জন্য ২ পয়েন্ট করে কাটা হবে। এরপর যত ওভার স্লো রেট হয়, তত ওভারের পয়েন্ট কাটা হবে। স্লো ওভার বেশি হলে পয়েন্টও বেশি কাটা হয়ে যাবে।

কিভাবে ফাইনালিস্ট নির্ধারণ করা হবে এবং কবে হবে ফাইনাল?
দুই বছরের সাইকেল এবং নির্ধারিত ২৭টি সিরিজ শেষে যে দুটি দল পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকবে, তারাই মুখোমুখি হবে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে। যেটা অনুষ্ঠি হবে ২০২১ সালের জুনে, লন্ডনের বিখ্যাত লর্ডস স্টেডিয়ামে।

যদি ফাইনাল ড্র হয় কিংবা টাই হয়, তাহলে কি হবে?
যদি ফাইনাল ড্র কিংবা টাইতে শেষ হয়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলকেই যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হবে। যদিও খেলার অবস্থা রিজার্ভ ডেতে নিয়ে যাওয়ার মত থাকে, তবুও। তবে রিজার্ভ যে তখনই ব্যবহার করা হবে, যদি কোনোভাবে নেট প্লেইং টাইম কোনোভাবে নষ্ট হয়, তাহলে।

নেট প্লেইং টাইম হচ্ছে, প্রতি টেস্টে কম করে ৩০ ঘণ্টা করে সময়। প্রতিটি দিন ৬ ঘণ্টা করে। নির্ধারিত এই সময়টা যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাহলে সেটা পূরণ করার জন্যই কেবল রিজার্ভ ডেতে যেতে পারে খেলা।

তবে এখানে যদি এমন হয়, বৃষ্টির কারণে খেলার আধাঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, তাহলে সেটা রির্জাভ ডেতে যাবে না। কারণ, যে স্বল্প সময়টুকু নষ্ট হয়েছে, সেটাকে ওইদিনই পুরণ করে নেয়া সম্ভব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে পুরো একটি দিন নষ্ট হয়ে গেলো, তখন রিজার্ভ ডে ব্যবহার করা হবে।

আইসিসির বাকি তিন পূর্ণ সদস্যের কি হবে?
বাকি তিন পূর্ণ সদস্যের মধ্যে জিম্বাবুয়ে বর্তমানে আইসিসি কর্তৃক নিষিদ্ধ। ক্রিকেট বোর্ডের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে আইসিসি তাদেরকে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এছাড়া আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ড এফটিপি অনুসারে টেস্ট সিরিজ খেলে যাবে। সিরিজে প্রাপ্ত পয়েন্ট আইসিসি র‌্যাংকিংয়ের জন্য হিসেব করা হবে, তবে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য নয়।

Loading...
আরও পড়ুন