শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির অর্ধেকই এস আলমের, ব্যাংক খাতে বিপদসংকেত

সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর বিস্ফোরক তথ্য

দেশের ২০ শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের ১০টিই চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি।

শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির অর্ধেকই এস আলমের, ব্যাংক খাতে বিপদসংকেত 1

সোমবার (৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রী একই সঙ্গে তিনি শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকাও সংসদে তুলে ধরেন।

তালিকায় থাকা এস আলম গ্রুপের ১০টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে— এস. আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস. আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস. আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস. আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস. আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড এবং ইনফিনিটি সি আর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় থাকা অন্য ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ও বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেড এবং সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড ও পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড।

তালিকায় এছাড়া রয়েছে— কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, কর্ণফুলী ফুডস (প্রাইভেট) লিমিটেড, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং রংধনু বিল্ডার্স (প্রাইভেট) লিমিটেড।

খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, যেসব ব্যাংকে ১০ শতাংশের বেশি শ্রেণীকৃত ঋণ রয়েছে, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতি তিন মাসে বৈঠক করে খেলাপি ঋণ আদায়ের সমস্যা চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং সমাধানের জন্য কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় শীর্ষ ২০ খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণ পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এছাড়া যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বেশি, সেগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ব্যাংকিং কোম্পানি (সংশোধন) আইনের আলোকে একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এস আলম পরিবারের হাতে পাচার ১২ বিলিয়ন ডলার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের মোট পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। পাচার করা অর্থ উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, এস আলম পরিবার একাই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল আলম মাসুদ ও তার সহযোগীরা একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ঋণ ও আমদানি জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেয়।

সাইফুল আলম মাসুদ ২০০৯ সালে সাইপ্রাস এবং ২০২০ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নেন। এরপর ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর তিনি, তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং তাদের তিন ছেলে আহসানুল আলম, আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহির বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। একই দিন বিদেশি নাগরিক হিসেবে পরিবারটি বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল বা পিআর পায়। বর্তমানে এস আলম পরিবার সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে বসবাস করছে।

সিপি

ksrm