শিপ ব্রেকার্সের ভোটে অযোগ্য ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ আমজাদ, পথ খুলে দিলেন আপিল বিভাগ

চট্টগ্রামের শিপব্রেকিং খাতের অন্যতম আলোচিত নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত সভাপতি পদপ্রার্থী আমজাদ হোসেন চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকল না। ঋণখেলাপির অভিযোগে বাতিল হওয়া তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ফলে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে এবং নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না আমজাদ চৌধুরী।

সোমবার (৯ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এ আদেশ দেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে বিএসবিআরএর নির্বাচন আয়োজনে আর কোনো বাধা থাকছে না।

আমজাদ চৌধুরী সম্প্রতি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহসভাপতি মনোনীত হয়েছেন। কিন্তু ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হয়ে সেই নির্বাচনে তিনি কিভাবে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন—সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আমজাদ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই। আসলাম চৌধুরী গত সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে সর্বাধিক ভোট পেলেও ঋণখেলাপের অভিযোগে তার ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে আদালতের নির্দেশে।

চলতি বছরের ৩ জুন বিএসবিআরএর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সংগঠনটির মোট ভোটার ৮৬ জন। দুই বছর মেয়াদের জন্য সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, দুই সহসভাপতি এবং সাতজন নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন।

ঋণখেলাপির অভিযোগ ও প্রার্থিতা বাতিল

গত ৩০ এপ্রিল ঋণখেলাপির অভিযোগে আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে বিএসবিআরএর নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তালিকায় রাইজিং স্টিল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন চৌধুরীর নাম ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে রয়েছে। তাঁর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

প্রার্থিতা বাতিলের পর তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁর দাবি ছিল, ঋণখেলাপি সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। এ যুক্তিতে গত ১ জুন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন তিনি। রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি বিষ্ণুদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি আসিফ হাসানের বেঞ্চ তাঁর সভাপতি পদে প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে রুল জারি করেন।

তবে হাইকোর্টের আদেশের পরদিনই বিএসবিআরএ নির্বাচন বোর্ড এক নোটিশে ৩ জুন অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে চলমান কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।

আপিল বিভাগে পাল্টা আইনি লড়াই

এরপর গত ৩ জুন হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান আখতার উল চৌধুরী। বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের বেঞ্চে আংশিক শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আমজাদ চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি না হওয়া পর্যন্ত বিএসবিআরএর নির্বাচনের সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর আগে আমজাদ চৌধুরী নির্বাচন আপিল বোর্ডের কাছেও আপিল করেছিলেন। গত ৬ মে অনুষ্ঠিত শুনানিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনে তাঁকে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তাঁর আপিল নামঞ্জুর করা হয়। পরে গত ১০ মে লিখিত আদেশে নির্বাচন আপিল বোর্ড তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করে।

নির্বাচনী বোর্ডের এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই তিনি ১ জুন হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত হওয়ার পর ৮ জুন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে নির্বাচনের সব কার্যক্রমও স্থগিত রাখা হয়েছিল। গত সোমবারের আদেশে সেই জটিলতার অবসান হলো।

বিতর্কিত কমিটি ও প্রশাসক নিয়োগ

বিএসবিআরএকে ঘিরে বিরোধ নতুন নয়। গত ১৬ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে সংগঠনের ১১টি পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় সবাই ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। ওই ঘোষণায় আমজাদ হোসেন চৌধুরী নিজেকে সভাপতি নির্বাচিত বলে দাবি করেন। একইভাবে সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে মহসিন চৌধুরী, সহসভাপতি হিসেবে নাওশীর হাসান ও গাজী মোকারম আলী চৌধুরীর নাম ঘোষণা করা হয়। নির্বাহী সদস্য হিসেবে হোসাইনুর আরেফীন, এস এম নুরুন নবী, নুর উদ্দিন রুবেল, মো. তসলিম উদ্দিন, ফেরদৌস ওয়াহিদ, মো. সেলিম উদ্দিন এবং ইয়ামিন ওবাইদা আসাদীর নামও উল্লেখ করা হয়।

তবে নির্বাচন বোর্ড ওই স্বঘোষিত কমিটিকে স্বীকৃতি দেয়নি। গত বছরের ২৫ অক্টোবর সংগঠনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ১১টি পদের বিপরীতে ১১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিলেও আমজাদ চৌধুরীর অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়।

পরে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি আমজাদ চৌধুরীকে অপসারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সচিব আবু সাফায়াৎ মুহাম্মদ শাহেদুল ইসলামকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সিপি

ksrm