লোভে পড়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিমানকে খুন করেন রিকশাচালক

টাকা ও স্বর্ণের লোভে এক রিকশাচালক গলা কেটে খুন করেন চট্টগ্রামের পটিয়ার স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিমান ধরকে। এ ঘটনায় মামলার ১০ দিনের মাথায় মূলহোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

প্রথমে বাপ্পু ধর ও জিল্লুর রহমান নামের সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পটিয়া জুডিশিয়াল আদালতের বিচারক বিশ্বেশ্বর সিংহের আদালতে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করলে তাদের পৃথক পৃথক ৫ দিন করে ১০ দিনের রিমান্ড মন্জুর করেন আদালত। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকালে ফটিকছড়ি উপজেলার পাইনদং এলাকার নানার বাড়ি থেকে আইয়ুব আলী (১৯) নামের এ খুনিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকালে গ্রেপ্তার আইয়ুব আলী চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত-২ এর বিচারক নাজমুন নাহারের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

শনিবার রাতে পটিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তারিক রহমান আলোচিত ক্লুলেস এ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন স্থানীয় সাংবাদিকদের সামনে।

মো. তারিক রহমান বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর আগে এলাকায় সুপারি চুরি করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে অপেশাদার খুনি রিকশাচালক জিল্লুর রহমানের দুই পা ভেঙে যায়। সেই থেকেই তার পা দুটি বাঁকা। সেই বাঁকা পায়ে এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতেন। এলাকায় রিকশা চালানোর সুযোগে সে অনেক দিন ধরে স্বর্ণ ব্যাবসায়ী বিমান ধরের মোটরসাইকেলযোগে লড়িহরা সড়ক দিয়ে রাতে যাতায়াত সম্পর্কে ধারণা পায়। জানতে পারে চট্টগ্রাম শহরে সাতটি স্বর্ণের দোকান আছে বিমানের। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রতিদিন রাতে পটিয়ার গ্রামের বাড়িতে আসার সময় বিমানের কাঁধে থাকা ব্যাগে করে নগদ টাকা ও স্বর্ণেরবারসহ অলঙ্কার নিয়ে আসে। সেই লোভেই গত ৩ সেপ্টেম্বর জিল্লুর রহমান সন্ধ্যায় একই এলাকার রাজমিস্ত্রি আইয়ুব আলীকে জরুরি কথা আছে বলে তার রিকশায় ডেকে নেন নিমতল এলাকা থেকে। এ সময় জিল্লুর রিকশা চালাতে চালাতে আইয়ুব আলীকে নিয়ে যান নয়াহাট এলাকার গাজীপাড়ার বিটা সড়কে। সেখানে গিয়ে জিল্লুর বলে, আমরাতো গরিবের ছেলে, কষ্ট করে চলছি। এমন একটা কাজ করব সহজেই বড় লোক হয়ে যেতে পারব। ওইদিন জিল্লুর বিমান ধর সম্পর্কে ধারণা দেয় আইয়ুব আলীকে। সেদিন থেকেই পরিকল্পনা করে রাতের আঁধারে কিভাবে স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিমান ধরের পথরোধ করে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনতাই করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে পর পর তিনদিন তাকে ফলো করে রিকশার সিটের ভেতর ধারালো অস্ত্র দা রেখে নিমতল স্কুল এলাকায় রিকশা নিয়ে ঘুরাঘুরি করতেন। কিন্তু মানুষের চলাচলের কারণে তাদের মিশন সফল হয়নি। গত ৬ সেপ্টেম্বর রাত ১১ টার দিকে বিমান ধর মোটরসাইকেল করে লড়িহরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সড়ক দিয়ে তার বাড়িতে যাওয়ার সময় বাড়ির অদূরে রাতের আঁধারে জিল্লুর ও আইয়ুব আলী রিকশা দিয়ে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে পথরোধ করে। এ সময় ছিনতাইয়ের এক পর্যায়ে জিল্লুর বিমান ধরের গলায় দা ধরে যা কিছু আছে সব নিয়ে ফেলার জন্য ধস্তাধস্তি করতে থাকেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ সময় ভয়ে আইয়ুব আলী কিছু দূর চলে যান। কিন্তু জিল্লুর রহমান বিমান ধরকে তার পা দিয়ে কৌশলে আটকে রেখে ধারালো অস্ত্র গলায় ধরে রাখেন। কিন্তু পরে আইয়ুব আলী ফিরে আসলে বিমান ধরকে ধরে দুজন মিলে কোপাতে থাকেন। এরপর বিমান ধর ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন দূর থেকে এগিয়ে আসতে থাকে। তা দেখে বিমান ধরকে জবাই করে আইয়ুব আলী পুকুরের পাড় ধরে পশ্চিম দিকে আর জিল্লুর রহমান রিকশা চালিয়ে চলে যায়। এ সময় হত্যাকারীরা হত্যায় ব্যবহৃত দা এবং বিমান ধরের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলও রেখে পালিয়ে যায়।’

আলোচিত এ মামলাটি ছিল একেবারেই ক্লুলেস—জানিয়ে তারিক রহমান বলেন, ‘পুলিশ সুপার স্যার, দক্ষিণের পুলিশ সুপার ক্রাইম স্যারের দিক নির্দেশনায় আমরা হত্যার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করি। খুনিদের ধরা খু্ব মুশকিল ছিল। তারা পেশাদার খুনি নয় বলে তাদের ধরতে বেগ পেতে হয়েছে। অপেশাদার খুনি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে এলাকায় রিকশা চালাতে থাকেন জিল্লুর রহমান। আর আইয়ুব আলীও রাজমিস্ত্রির কাজ করতে থাকেন সাধারণের মতো। মূলত তাদের উদ্দেশ্য ছিল, স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিমান ধরকে পথরোধ করে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা স্বর্ণের বার ছিনতাই করে রাতারাতি বড় লোক হয়ে যাওয়া।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিক রহমান আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কারা জড়িয়ে থাকতে পারে, তাদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!