লোক ধরে আনার পর জেনুইন বেকারিই হয়ে ওঠে ‘ইপিজেড থানা’

পুলিশ-সোর্স মিলে গ্রেপ্তার বাণিজ্যে ১০ জনের চক্র

0

গ্রেপ্তার করে থানায় নয়, নিয়ে যাওয়া হয় একটি বেকারিতে। ওই বেকারিতে আটক করা ব্যক্তিকে বসিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় অর্থ। এমন দৃশ্য চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড এলাকায় নিত্যদিনের ঘটনা। নানা অভিযোগে লোকজনকে ধরে এনে থানায় না নিয়ে ‘জেনুইন বেকারি’তে বসিয়ে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে সেখানকার সোর্স মহিবুল্লাহ, ৬ নারী সোর্সসহ চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানার তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া প্রতিদিন শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে আসা প্রবাসীদের অবৈধ জিনিসপত্র চেক করার কথা বলে নানা হয়রানি করে বাণিজ্য করেন এ কর্মকর্তারা।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি এক লিখিত অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ইপিজেড থানা পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক, ২ জন সহকারী উপ-পরিদর্শক ও ৭ জন সোর্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়।

অভিযুক্তরা হলেন ইপিজেড থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক রবিউল আওয়াল তালুকদার, সহকারী উপ-পরিদর্শক নাসির উদ্দিন, সহকারী উপ-পরিদর্শক আহম্মদ নুর। সোর্সরা হলেন মহিবুল্লাহ (বরিশাল জেলার বাসিন্দা), রুবিনা (বরিশাল জেলার বাসিন্দা), মালা, রুনা, খাদিজা, সালমা ও প্রিয়া। এরা সবাই ইপিজেড থানার বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বন্দরটিলা নয়ারহাট জাকিরের পানের দোকানের সামনে বিপিএল খেলা দেখতে জড়ো হয়েছিল। সেখান থেকে জুয়ার অভিযোগ তুলে এনে স্থানীয় ৮জন যুবককে আটক করে থানায় না নিয়ে ইপিজেড লেবার কলোনি মাঠে আটক রাখেন ওই কর্মকর্তারা। পরে নানা দেনদরবার করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা নেওয়ার পর সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর সোর্স মহিবুল্লাহর তথ্যের ভিত্তিতে ইপিজেড থানার সল্টগোলা ক্রসিং থেকে গোপন সংবাদের খবরের ভিত্তিতে গাড়ি থামিয়ে দেশে তৈরি ৪টি বিয়ারসহ জাহিদুল ইসলাম (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। আটকের পর তাকে থানায় না নিয়ে বসিয়ে রাখা হয় ইপিজেড থানার পাশে জেনুইন বেকারিতে। পরে আটক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪২ হাজার টাকা নেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইপিজেডের মোড় থেকে রিকশার ভেতর থেকে সোর্স সালমার প্রেমের ফাঁদে পড়ে আটক হন কবির নামের এক পোশাক শ্রমিক। পরে সেখান থেকে কৌশলে ধরে নিয়ে তাকে আটক রাখা হয় থানার পাশের জেনুইন বেকারিতে। পরে আটক ব্যক্তিকে ২ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে তার কাছ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নিষিদ্ধ ‘তক্ষক’ বিক্রির অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কলসিদিঘীর পাড় এলাকায় জাকিরের দোকানের সামনে একটি ভাড়া বাসা থেকে পানের এক দোকানদারসহ মোট পাঁচ জনকে আটক করে বসিয়ে রাখেন জেনুইন বেকারিতে। প্রায় ৪ ঘণ্টা পর আটককৃত ৪ জনের কাছ ২ লাখ এবং পানের দোকানদারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি বন্দরটিলা থেকে ১ হাজার ৭০০ পিস ইয়াবাসহ জাকির ও পারভেজ নামের দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় ওই পুলিশ সদস্যরা। প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা দেনদরবারের পর কোন মামলা না দিয়ে নগদ ৪ লাখ টাকা নিয়ে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে এসব সোর্সদের তথ্যের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সময়ে সিমেন্ট ক্রসিং এলাকায় তল্লাশির নামে বিদেশ থেকে আসা প্রবাসীদের হয়রানি করা হয়। পরে অর্থের দেনদরবারে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ অভিযোগের বিষয়ে ইপিজেড থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক আহম্মদ নুর ও নাসির উদ্দিনকে মুঠোফোনে জানতে চাইলে দুই কর্মকর্তাই অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তারা বলেন, ‘আমাদের কেউ এই ধরনের কাজ করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’

এ বিষয়ে ইপিজেড থানার উপ-পরিদর্শক রবিউল আওয়াল তালুকদারকে বেশ কয়েকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তার বাণিজ্য করার বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগের বিষয়ে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এসএস/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন