একদিকে টানা লোকসান, অডিট প্রতিবেদনে একের পর এক আর্থিক দুর্বলতা, বছরের পর বছর ব্যাংকে জমা না হওয়া চেক, পৃথক গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অনুপস্থিতি এবং অগ্রিম অর্থ সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন। অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানে একটি কমিটির এক দিনের সভায় ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। একই সময়ে নির্মাণাধীন প্রধান কার্যালয় ভবনের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় (ভ্যারিয়েশন) অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (চট্টগ্রাম ওয়াসা) আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
চলতি বছরের ২২ জুন চট্টগ্রাম ওয়াসার সভাকক্ষে কর্মসম্পাদনে সহায়তা প্রদান কমিটির ষষ্ঠ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সভাটি প্রথমে ১৪ জুন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সে লক্ষ্যে গত ৮ জুন সচিবালয়ের অফিস তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ শরফত আলীর নামে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা অগ্রিম অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে সভার তারিখ পরিবর্তন করে ২২ জুন নির্ধারণ করা হয়। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এ অর্থ সমন্বয় করা হবে।
৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ড পুনর্গঠন না হওয়ায় আগের বোর্ডের কাঠামো অনুসরণ করে একজন ছাত্র প্রতিনিধিকে যুক্ত করে কর্মসম্পাদনে সহায়তা প্রদান কমিটি গঠন করা হয়। কার্যত এই কমিটিই বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, অডিট প্রতিবেদন এবং সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় সংস্থাটির আর্থিক শৃঙ্খলা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় একাধিক অসঙ্গতির চিত্র উঠে এসেছে।
অডিটে ১৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার নিট লোকসান
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্ম এম আর এইচ দে অ্যান্ড কোং নিরীক্ষিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরে চট্টগ্রাম ওয়াসার মোট আয় হয়েছে ২৮৯ কোটি ৩৫ লাখ ৫ হাজার ৩৮২ টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৩০৬ কোটি ১৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪১১ টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে সংস্থাটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৮৩ লাখ ৫৩ হাজার ২৯ টাকা।
অডিটে দেখা যায়, পানি বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ৬৭ হাজার ১৯০ টাকা। আর মেয়াদি আমানতের সুদসহ অন্যান্য উৎস থেকে এসেছে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
লোকসানের মধ্যেও ২১৮ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত
অডিট অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) হিসেবে বিনিয়োগ রয়েছে ২১৮ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার ২৫৮ টাকা।
অডিট প্রতিবেদনে এসব আমানতের প্রকৃতি বা পরিচালন লোকসানের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে পৃথক কোনো বিশ্লেষণ দেওয়া হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিচালন লোকসানের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থায়ী আমানতে রাখা হলে সংস্থাটির নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
বছরের পর বছর ব্যাংকে জমা হয়নি চেক
অডিটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে উপস্থাপন না হওয়া পুরোনো চেক। সভায় এসব চেক বাতিল ও নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হলেও মোট কতটি চেক রয়েছে, সেগুলোর আর্থিক মূল্য কত, কত বছর ধরে ঝুলে আছে কিংবা দায়ী কর্মকর্তা কারা, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন চেক অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
অগ্রিম অর্থ সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন
অডিটে বিভিন্ন অগ্রিম অর্থ সমন্বয়ের বিষয়েও পর্যবেক্ষণ এসেছে। নথি অনুযায়ী, সভাটি প্রথমে ১৪ জুন আয়োজনের জন্য নির্ধারিত ছিল। সে অনুযায়ী গত ৮ জুন সচিবালয়ের অফিস তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ শরফত আলীর নামে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা অগ্রিম অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে সভার তারিখ পরিবর্তন করে ২২ জুন নির্ধারণ করা হয়। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অগ্রিম অর্থ সমন্বয় করা হবে।
এক দিনের সভায় ব্যয় ২ লাখ ২৭ হাজার টাকা
চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মসম্পাদনে সহায়তা প্রদান কমিটির ষষ্ঠ সভার ব্যয় বিবরণীতে দেখা যায়, সদস্যদের সম্মানী বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সভায় ৫০টি নাস্তার প্যাকেটের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮ হাজার ৫০০ টাকা, অর্থাৎ প্রতিটি প্যাকেটের মূল্য ১৭০ টাকা। ৪০টি লাঞ্চ বক্সের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা, অর্থাৎ জনপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা। এ ছাড়া বিমান ভাড়ায় ব্যয় হয়েছে ৪০ হাজার ৫৯৬ টাকা, স্টেশনারি বাবদ ৫ হাজার টাকা, ফুলের তোড়ায় ২ হাজার ৬৪০ টাকা, বড় আকারের অর্গানোগ্রাম প্রিন্টে ৩ হাজার টাকা এবং অটো সিলে ২০০ টাকা।
সভার জন্য আগে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা অগ্রিম নেওয়া হলেও মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৯৩৬ টাকা। অর্থাৎ অগ্রিম অর্থের বাইরে অতিরিক্ত ১৭ হাজার ৯৩৬ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি কমিটির এক দিনের সভায় এত বড় অঙ্কের সম্মানী, যাতায়াত ও আপ্যায়ন ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, সভায় যাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের অনেকেরই ওয়াসার কার্যক্রম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই।
পৃথক গ্র্যাচুইটি ফান্ড নেই
অডিটে আরও উঠে এসেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়নি। সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হলেও কবে ফান্ড গঠন হবে, কত অর্থ প্রয়োজন কিংবা এত দিন কেন তা হয়নি, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
ভবন নির্মাণে আরও ২ কোটি টাকার ভ্যারিয়েশন
নির্মাণাধীন প্রধান কার্যালয় ভবনের জন্য অতিরিক্ত ২ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার ৭২ টাকা ব্যয়ের ভ্যারিয়েশন অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। এতে মূল চুক্তিমূল্য প্রায় ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ২০১৩ সালে ২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকার চুক্তিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মূল ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট সিভিল ওয়ার্কসের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব আনা হয়েছে। অতিরিক্ত কাজের মধ্যে রয়েছে পার্টিশন ওয়াল, টাইলস, প্লাস্টার, ডব্লিউপিসি দরজা, গ্লাস ক্যানোপি, সিপিভিসি পাইপ, সড়ক উন্নয়নসহ অন্যান্য সিভিল কাজ।
এসব কাজের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও প্রশ্ন উঠেছে, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এগুলো কেন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং পরে কেন ভ্যারিয়েশনের প্রয়োজন হলো।
তিন সদস্যের কমিটি
ভ্যারিয়েশন যাচাইয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কর্মসম্পাদনে সহায়তা প্রদান কমিটির সদস্য সৈয়দা জেরিন হোসেনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (টিএন্ডপি)। কমিটিকে পরবর্তী সভায় বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে এর আগে ভ্যারিয়েশন প্রতিপাদন কমিটি ব্যয় বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডে কারা আছেন
চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ডে সদস্য হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব (অডিট) সামছুল হক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব ডা. মুস্তাফিজুর রহমান, অর্থ বিভাগের উপসচিব শওকত উল্লাহ, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মঈন উদ্দিন ইকবাল, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুজিত হাওলাদার, পানি ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধি সৈয়দা জেরিন হোসেন এবং ছাত্র প্রতিনিধি রাসেল মিয়া। লালমনিরহাটের বাসিন্দা রাসেল মিয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা।
অডিট অনুমোদন, কিন্তু রয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
২২ জুন অনুষ্ঠিত কর্মসম্পাদনে সহায়তা প্রদান কমিটির ষষ্ঠ সভায় অডিট রিপোর্ট সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করা হয়। তবে অডিটে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর বাস্তবায়নে কোনো সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার সাম্প্রতিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিষয়টি শুধু একটি অর্থবছরের লোকসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প পরিকল্পনা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক দুর্বলতার ইঙ্গিতও এতে উঠে এসেছে। অডিটে চিহ্নিত অনিষ্পন্ন চেক, অগ্রিম অর্থ সমন্বয়, গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অনুপস্থিতি এবং একই সময়ে সভা ব্যয় ও প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সভার কার্যবিবরণী ও অডিট প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যাংকে জমা না হওয়া চেকের মোট আর্থিক মূল্য, কত বছর ধরে সেগুলো ঝুলে আছে, দায়ী কর্মকর্তা কারা, অগ্রিম অর্থ সমন্বয়ে অডিটের পর্যবেক্ষণ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, গ্র্যাচুইটি ফান্ড এত দিন গঠন না হওয়ার কারণ এবং ২০১৩ সালের প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন কেন হলো, এসব বিষয়ে কোনো সময়সীমাভিত্তিক সিদ্ধান্ত বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জানে আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিপি




