‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’ : আমল ও পাঠের মহিমা

মহান আল্লাহ মানুষ ও জিন সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। মানুষকে সেই ইবাদতে স্থির রাখতে রয়েছে অসংখ্য মাধ্যম, যার মধ্যে জিকির বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আল্লাহর স্মরণ হৃদয়কে সজাগ রাখে, নষ্ট সময়কে সংযমে ফেরায় এবং ইবাদতে মনোযোগী করে। এই স্মরণের মধ্যেই রয়েছে এক মহিমান্বিত বাক্য—‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’। এর অর্থ, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ভরসা নেই, কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই।’ মানুষের সক্ষমতা যতই দৃশ্যমান হোক, আল্লাহ না চাইলে কেউ কিছুই করতে পারে না। তাঁর তাওফিক ছাড়া কোনো নেক আমল সম্ভব হয় না, কোনো গুনাহ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় না।

বিপদে আশ্রয় ও সাহায্যের জিকির

বিপদের আশঙ্কা তৈরি হলে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে কিংবা স্বাভাবিক অবস্থাতেই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হলে এ দোয়া পড়া যায়। আবু মুসা আশআরি (রা.) বর্ণনা করেন, নবিজি (সা.) তাঁকে বলেছেন—‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’ জান্নাতের একটি ধনভাণ্ডার। আরও কয়েকটি হাদিসে এই দোয়াকে জান্নাতের ধনভাণ্ডার ও জান্নাতের দরজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জিকির মুমিনের জীবনে আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস। এই বিশেষ দোয়া মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা স্মরণ করায় এবং আল্লাহর সর্বশক্তিমান ক্ষমতার প্রতি ঈমানকে দৃঢ় করে। কঠিন সময়, দুশ্চিন্তা কিংবা কোনো কাজের আগে এটি পাঠ করা মুমিনকে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা শিখিয়ে দেয়।

অর্থ ও তাৎপর্য

এ বাক্যের অর্থ, ‘কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়া।’ মানুষের নিয়ন্ত্রণে কিছুই নেই—সব কিছু আল্লাহর হাতে। সকল সাফল্য, সহায়তা ও মুক্তির উৎস একমাত্র আল্লাহ—এই স্বীকৃতি মানুষকে তাঁর প্রতি নির্ভরশীল হতে শেখায়।

হাদিসে ফজিলত

হাদিসে এই জিকিরের গুরুত্ব ও পুরস্কার স্পষ্টভাবে বর্ণিত। আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) বলেন, নবিজি (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’ পাঠ করে, তা জান্নাতের ধনসম্পদের একটি। এই জিকিরের ফজিলতের মধ্যে রয়েছে গুনাহ মাফ, দুশ্চিন্তা দূর হওয়া, জান্নাতের পথে সহায়ক হওয়া এবং শয়তানের প্রতারণা থেকে সুরক্ষা পাওয়া।

কখন পড়া হয়

এ জিকির সাধারণভাবে যেকোনো সময় পড়া যেতে পারে। তবে কঠিন পরিস্থিতিতে সাহস জোগাতে, যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে আল্লাহর সহায়তা কামনায়, সকাল–সন্ধ্যার নিয়মিত জিকিরে অথবা ফরজ নামাজের পর এটি বিশেষভাবে পাঠ করা হয়।

আনাস ইবন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, কেউ যখন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’ পাঠ করে, তখন ফেরেশতারা বলেন—তুমি যথেষ্ট করলে, নিরাপদ হলে, শয়তান দূরে সরে গেল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, যে ব্যক্তি এই দোয়া পড়ে নিজের গুনাহের ক্ষমা চাইবে কিংবা অন্য কোনো দোয়া করবে, আল্লাহ তা কবুল করবেন।

গুরুত্বপূর্ণ ইস্তিগফার

ইস্তিগফারের দোয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে —‘লা ইলাহা ইল্লালাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। আলহামদুলিল্লাহি ওয়া সুবহানাল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ।’

আরেকটি ইস্তিগফার—‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম ওয়াতুবু ইলাইহি।’ অর্থ, ‘আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি, যাঁর ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও চিরন্তন, এবং আমি তাঁর দিকেই ফিরে যাচ্ছি।’ এই দোয়া পাঠে গুনাহ মাফ হয়, বিপদ দূর হয়, রিজিক বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

সাগরের ফেনার মতো গুনাহ মাফ

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’, তার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়, যদিও তা সাগরের ফেনার মতো অনেক হয়। অর্থ—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহ মহান, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপমুক্তির কোনো রাস্তা নেই, তাঁর সাহায্য ছাড়া ইবাদতের শক্তি নেই।

শেষাবধি ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’। আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm