লাখ টাকা বেতনের লোভে বিএসসির ড্রাইভারের বয়স কারসাজি, বদলির আদেশও অমান্য

মো. নুর নবী। প্রায় লাখ টাকা বেতনে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) বানিজ্য সেলের কার ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করেন। ১৯৯০ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া নবীর জন্ম ১৯৬৪ সালে। সেই হিসেবে নবীর চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালের মার্চে। কিন্তু তিনি এখনও চাকরি করে যাচ্ছেন। লাখ টাকা বেতনের লোভ ও আনুষঙ্গিক সুবিধা নিতেই তিনি মূলত এমনটা করেছেন। বয়স লুকানোর এ কাজে তাকে সহযোগিতা বিএসসির কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। একইসঙ্গে তাকে গত মার্চে বদলি করা হলেও যোগ দেননি নতুন কর্মস্থলে।

নুর নবীর সেই কারচুপি ধরা পড়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে। যার প্রতিফলন ঘটেছে শ্রম আদালতের রায়েও

জানা গেছে, চাকরিতে প্রবেশকালে নবীর সকল কাগজপত্রে ও সিবিএ’র ভোটার তালিকাতে তার জন্ম সাল ১৯৬৪ লেখা ছিল ২০১৪ সাল পর্যন্ত। কিন্তু ২০১৫ সালে এসে বিভিন্ন কাগজপত্রে তার জন্ম সাল হয়ে যায় ১৯৬৮।

নুর নবীর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও চাকরি করার বিষয়ে প্রথমে আপত্তি জানিয়ে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় বরাবরে আবেদন করে শিপিং কর্পোরেশনের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) নেতারা। সেই আবেদনটি আমলে নেয় নৌ মন্ত্রণালয়। নৌ মন্ত্রণালয়েও নবীর জন্মসাল ১৯৬৪ বলে প্রমাণিত হয়। এক বিজ্ঞপ্তিতে নুর নবীর জন্ম সাল ১৯৬৪ হিসেবে গণনা করে সকল কাজ সম্পাদন করতে হবে বলে বিএসসিকে নির্দেশও দেয় মন্ত্রণালয়।

কিন্তু সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে নুর নবী শ্রম আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। দীর্ঘ সময় পর শ্রম আদালত সেই আবেদনটি খারিজ করে নুর নবীর বয়স লুকানোর কাজটিকে ‘চতুরতার সামিল’ বলে আখ্যা দেন।

নুর নবী ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে কর্মচারী ওয়েলফেয়ার লোনের আবেদনেও জন্ম সাল ১৯৬৮ উল্লেখ করেন। এই ওয়েলফেয়ারের অ্যাকাউন্ট থেকে সামান্য কিছু টাকা রেখে ১৮ লাখ টাকা তুলে নেন তিনি।

এ বিষয়ে বিএসসির আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র লালা বলেন, ‘সে (নুর নবী) বয়স লুকানোর কারচুপি করেছে।’

দুই বিজ্ঞপ্তি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের

শিপিং কর্পোরেশনের সিবিএ নেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় দুটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিএসসিকে ২০২৩ সালে ৩ সেপ্টেম্বর প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে নুর নবীর চাকরিতে যোগদানের সময়কার কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

এরপর একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আরও একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, জন্ম তারিখ পরিবর্তনযোগ্য নয়। নুর নবীর জন্ম সাল ০২-০৩-১৯৬৪-ই সঠিক মর্মে বিবেচনায় নিয়ে সকল কাজ সম্পাদন করতে হবে। বিএসসির গাড়িচালক নূর নবীর জন্ম তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে উল্লেখিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

নৌ মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে চট্টগ্রামের ২য় শ্রম আদালতে আপিল করেন নুর নবী।

শ্রম আদালতের রায়

নিষেধাজ্ঞার আবেদনটির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করেন ২য় শ্রম আদালত। সেখানে জন্ম সাল ১৯৬৮’র পক্ষে যেসকল যুক্তি উপস্থাপন করা হয়, সেগুলো ‘চতুরতার সামিল’ বলে আখ্যা দেন আদালত। একইসঙ্গে জন্ম সাল ১৯৬৪ ধরেই নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আদেশের ওপর নুর নবীর নিষেধাজ্ঞার আবেদনটি নামঞ্জুরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

তবে শ্রম আদালতে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষা সনদ ও বিবাহের কাবিনে নুর নবীর জন্ম সাল ১৯৬৮ উল্লেখ ছিল।

কী আছে বিএসসি’র নথিতে

বিএসসিতে কর্মরতদের ‘ভবিষ্য তহবিল’র জন্য প্রশাসন বিভাগে থেকে ১৯৯৪ সালের ৩ অক্টোবর একটি তালিকা ভবিষ্য তহবিল শাখায় পাঠানো হয়। ওই তালিকার ১৪ পৃষ্ঠার ২৬৭ নম্বর ক্রমিকে মো. নুর নবীর জন্ম সাল ১৯৬৪ উল্লেখ করা হয় এবং অবসর গ্রহণের তারিখ উল্লেখ করা হয় ১ মার্চ ২০২১। যদিও পরে সরকারি আদেশে সকল সরকারি চাকরিজীবীদের আরও দু’বছর বাড়ানো হয়। সেই হিসেবে নুর নবীর অবসরের সময় ২০২১ থেকে ২০২৩-এ গিয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া ৩য় এবং ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য কাগজে বয়স ও জন্ম তারিখের গড়মিল থাকায় কর্পোরেশন ২০০১ সালে সঠিক জন্ম তারিখ নির্ধারণের জন্য পাঁচ সদস্যর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসসি। ওই কমিটির প্রতিবেদনেও নুর নবীর জন্ম সাল ১৯৬৪ উল্লেখ রয়েছে।

বিএসসির প্রশাসন বিভাগ থেকে ২০০৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের আরও একটি তালিকা তৈরি করা হয়। সেই তালিকায়ও নুর নবীর অবসর গ্রহণের সময় ১ মার্চ ২০২১ উল্লেখ আছে।

সিবিএ নির্বাচনের আগে সরকারের শ্রম পরিদপ্তরে বিএসসির কর্মচারীদের ব্যক্তি সংক্রান্ত নথি পাঠাতে হয়, যা ভোটার তালিকা হিসেবে গণ্য হয়। সেই তালিকাগুলোর মধ্যে ১৯৯৬, ১৯৯৯, ২০০১, ২০০৩, ২০০৯ ও ২০১৩ সালের নির্বাচনের ভোটার তালিকায় নুর নবীর জন্ম সাল ১৯৬৪ উল্লেখ ছিল।

নুর নবীর পেছনে বড় কেউ!

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. নুর নবী বলেন, ‘আমার এমডি স্যার বলেছেন, এসব বিষয়ে কোনো কথা না বলতে।’

বিএসসির সিনিয়র কিছু কর্মকর্তাদের ইন্ধনে নুর নবী এসব কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, এমন অভিযোগের বিষয়ে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক ড. পিযূষ দত্ত বলেন, ‘নবী আমার ড্রাইভার তা ঠিক, তবে তার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। কর্পোরেশন যদি তার বদলে অন্য ড্রাইভার দেয়, তবে আমার কোনো আপত্তি নেই।’

ড. পিযূষ বলেন, ‘আমার ড্রাইভার হওয়ার কারণে নবী আমার কাছে আসতে পারে, তাই বলে তাকে কোনো রকম পরামর্শ আমি দিইনি। আমি শুনেছি, তার বিরুদ্ধে বয়স নিয়ে একটা ঝামেলার অভিযোগ আছে। তবে সে বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে রাজি না।’

তবে ড. পিযূষ মন্তব্য করতে রাজি না হলেও ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ বিএসসির প্রশাসন বিভাগ থেকে গাড়িচালক নুর নবীকে নির্বাহী পরিচালক বাণিজ্যের দপ্তর থেকে জিপিএ অ্যান্ড সিএসও’র পদায়ন করা হয়। কিন্তু এখনও অবদি সেই বদলির আদেশ অমান্য করে সেই পিযূষ দত্তের গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন নুর নবী।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!