লাইট আছে আলো নেই, ট্রাফিক চায় মেয়রের সিগন্যাল

0

চট্টগ্রাম নগরীর অনেক ব্যস্ততম সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি থাকলেও এই বাতির আলো জ্বলে না। এসব সড়কে যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ হাতের ইশারায় আর বাঁশি ফুঁকে নিয়ন্ত্রণ করে যান চলাচল। আলোর অভাবে অচল পড়ে আছে অনেক সিগন্যাল বাতি।

নগরীর ব্যস্ততম সড়ক আগ্রাবাদ এক্সেস রোড। ব্যস্ততম এ সড়কে যেখানে আটটি সড়কবাতি থাকার কথা, সেখানে রয়েছে মাত্র দুটি। একই চিত্র লালখানবাজার, কাজীর দেউড়ি, জিইসি, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর-বহদ্দারহাটের। অনেক সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে অকেজো সিগন্যাল বাতি। সেই সাথে অকেজো টাইম কাউন্টডাউন যন্ত্র। নগরীর ৪৬টি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি আছে, কিন্তু এই বাতির আলো জ্বলে না।

মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অসহায়ত্ব চোখে পড়েছে। সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আগ্রাবাদ মোড়ে দেখা মিলল অকেজো সিগন্যাল বাতির। চতুর্মুখী এ সড়কে দুজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন বাঁশি ফুঁকে আর হাতের ইশারায়। পতেঙ্গা থেকে আসা ১০ নম্বর বাস থামাতে ডান হাত উঁচিয়ে ইশারা দিলেন ট্রাফিক কনস্টেবল মামুন। আর বড়পুল দিক থেকে আসা ৭ নম্বরের যানবাহনগুলো চলতে ইশারা দিয়ে হাত নামালেন ট্রাফিক পুলিশ। হাত নামাতেই চলতে শুরু করল পতেঙ্গা থেকে আসা যানবাহনগুলো। বেলা দেড়টা থেকে ২টা পর্যন্ত জিইসি মোড় এলাকায় দেখা গেছে প্রায় একই রকম চিত্র। চারদিকে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালগুলোর দেখা মিললেও তা অচল।

আবার আগ্রাবাদ সিগন্যাল পয়েন্টে দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের হাতে থাকা সংকেত বাতিতে লাল আলো জ্বললেও সেই আলো উপেক্ষা করে এগিয়ে চলছে গাড়ির সারি। গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। গাড়ির চালক বা ট্রাফিক পুলিশ কেউই খেয়াল রাখছে না দাঁড়িয়ে থাকা সিগন্যাল বাতির দিকে। লাল-হলুদ-সবুজ যে বাতিই থাকুক না কেন, আলোর অভাবে গাড়িচালকরা অপেক্ষা করছে ট্রাফিক সদস্যদের হাত উঁচিয়ে সংকেত দেওয়ার দিকে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামের রাস্তায় ১৭টি রুটে চলাচলকারী প্রায় ১২ লাখ গাড়ি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে হাতের ইশারাতেই। নগরীর যানজট নিরসনে সরকার একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করলেও তা সমন্বয়হীনতার অভাবে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ প্রজেক্টের কর্মকর্তাদের বেতনভাতা ঠিকঠাক চললেও অচল রয়েছে নগরীর ৪৬টি সিগন্যাল পয়েন্টের বাতি। অথচ সেই দায় সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে সিটি করপোরেশন। ফলে দিন দিন নগরীতে যানজট অসহনীয় হারে বাড়ছে।

নগরীর বিভিন্ন মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গাড়ি চলাচল করে রাস্তাঘাটে। অন্যদিকে মানুষের মধ্যে সিগন্যাল দেখে চলা বা আইন মানার প্রবণতা নেই। তাই বাধ্য হয়েই হাতের ইশারায় যান নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।

জিইসি মোড়ে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, নগরীর অন্যান্য স্থানের মতো এখানকার অবস্থাও করুণ। বাতি থাকলেও তা অচল। আমরাও বা কতটুকু করতে পারি? আমরাও তো মানুষ!

তিনি আরও বলেন, ‘সিগন্যাল বাতি ঠিকমতো কাজ করলে আমাদের রোদ-বৃষ্টিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে দায়িত্ব পালন করতে হতো না।’

আরেক দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলেন, ‘এরাও দাঁড়িয়ে আছে, আমরাও দাঁড়িয়ে থাকি। তফাৎ আমাদের অনুভুতি আছে। গাড়ির সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। এটা দেখার কেউ নেই। আমাদের কষ্ট বুঝলে এতদিন এভাবে অকেজো পড়ে থাকে না সড়কবাতিগুলো। দেশ নাকি ডিজিটাল হচ্ছে! কিন্তু কাজ-কারবার দুইশ’ বছর আগের!’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ঝুলন কান্তি দাশ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণের দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ ট্রাফিক বিভাগের, আমাদের না। এ নিয়ে আমাদের কোনো বাজেটও নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনাকে একটা পরামর্শ দিচ্ছি। আপনি একটু মেয়র মহোদয়ের সাথে কথা বলেন। সিগন্যাল বাতি নিয়ে উনার একটা অবজারভেশন আছে। আমরা যদি উনার ইন্সট্রাকশন পাই, তাহলে আগাবো।’

ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুভাষ দে জানান, ‘সচল বা অচল যা-ই হোক, এগুলোর ব্যবহার নেই। আর এসব ঠিক করা কি আমাদের কাজ! এখন কি পুলিশ লাইটও ঠিক করবে! চসিক যদি না করে আমাদের কী করার আছে! সাবেক পুলিশ কমিশনার ইকবাল স্যার থাকা অবস্থায় বহুবার চিঠি পাঠিয়েছি, তবুও তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই। তাই ট্রাফিক পুলিশের ম্যানুয়াল অপারেটিং তথা হাত উঁচিয়েই চলছে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কাজ।’

নিউ মার্কেটগামী ৪নং লুসাই পরিবহনের চালক মো. সবুজ বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবে বাতি থাকলে দূর থেকে দেখতে পারতাম।’

যাত্রী ব্যবসায়ী সকুমার বড়ুয়া বলেন, ‘সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে বাতি থাকলে অনেক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। এদেশে এই আধুনিক যুগেও ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় চলতে হয়।’

এ প্রসঙ্গে সিএমপির ডিসি ট্রাফিক (উত্তর) মো. আমির জাফর চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা মেয়র মহোদয়ের সাথে দেখা করে এ বিষয়ে রিকুয়েস্ট (অনুরোধ) করেছি। এটা উনাদের পরিকল্পনার ভেতর আছে, তবে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই আমরা নিজ উদ্যোগে স্পন্সর নিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মোড়ে কাজ শুরু করেছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মূলত কাজটা চসিকের। আমরা এনফোর্সমেন্টের কাজটা করি। তাছাড়া যানজট নিরসনে ম্যানুয়েল পদ্ধতি অনেক কষ্টের। বাতি থাকলে আমাদের জন্য কাজটা সহজ হতো।’

এ বিষয়ে সিএমপির ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগের সাবেক ডিসি হারুন উর রশীদ হাযারী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, প্ল্যানিং, ইঞ্জিনিয়ারিং, এডুকেশন ও এনফোর্সমেন্ট— এ চার ভাগে ট্রাফিকের কাজ হয়। এর মধ্যে প্রথম তিনটি ভাগ পরিচালনার কাজ চসিকের। এনফোর্সমেন্টের কাজটা শুধু পুলিশ করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে হয়তো চারজন ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এই চারজনের পক্ষে যতগুলো গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তার চেয়ে অনেক বেশি গাড়ি চলাচল করে রাস্তায়। সেক্ষেত্রে যানজট নিয়ন্ত্রণে পুরানো পদ্ধতিতে ফিরতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ।’

প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনতে পারলে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে না বলেও মত দেন তিনি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী বেগম সালমা খাতুন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যালের বাতিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করে টেকনিক্যাল বিভাগের লোকজন। এ বিষয়ে আমরা অবগত নই।
ইউএসটিসির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের স্মার্ট সিটির জন্য যানজট সবচেয়ে বড় সমস্যা। এটা নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাফিক পুলিশ যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে তা জনস্বার্থে কতটা কাজে আসছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সম্ভব হলে আজ থেকেই এটা হওয়া প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, যানবাহনের তুলনায় সড়কের সংখ্যা খুবই কম। আধুনিক শহরের আয়তন অনুপাতে গড়ে ২৫ শতাংশ সড়ক থাকার কথা। কিন্তু নগরীতে সে পরিমাণ সড়ক নেই। তার ওপর স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির ট্রাফিক সিগন্যাল নগরীর সব সড়কে কাজ করে না। এটা চালুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সচেতন হলে নগরবাসী উপকৃত হবে।

এদিকে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু না থাকায় যানজট যেমন বাড়ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে নগরবাসীর মূল্যবান কর্মঘণ্টা। প্রায় পাঁচ বছর আগে এমসিসিআই ও দ্যা চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব লজিস্টিকস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট রাজধানীর যানজটের ওপর গবেষণা করে। ওই গবেষণায় যানজটের কারণে রাজধানীবাসীর প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় বলে উল্লেখ করা হয়, যা টাকার অংকে ৮৩ কোটি টাকা। যানজটের কারণে বছরে ২১ হাজার কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যিক ক্ষতি হয় বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

যানজট নিরসনে (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগকে ২০০১-০২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা দেয়া হলেও সে আওতায় নেই সিএমপি। বাজেটের অভাবে থমকে আছে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ- এমনটাই দাবি করছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে বছরের পর বছর অকেজো দাঁড়িয়ে আছে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি। চসিকের বিদ্যুৎ বিভাগ দায় এড়িয়ে একবার দোষ দিচ্ছে ট্রাফিক বিভাগের, আরেকবার দেখিয়ে দিচ্ছেন স্বয়ং মেয়রকে।

যদিও এ বিষয়ে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিআর

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন