লর্ডসের নতুন লর্ড ইংল্যান্ড নাকি নিউজিল্যান্ড?

ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল আজ

0

লর্ডসে নতুন লর্ডই পেতে যাচ্ছে ক্রিকেট বিশ্ব। হোক সেটি ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ড কিংবা নীরব ঘাতক নিউজিল্যান্ড। কিন্তু কে হতে যাচ্ছেন আগামী চার বছরের সেই রাজা? শেষ হাসি হাসবেন কে? স্বাগতিক ইংল্যান্ড নাকি নিউজিল্যান্ড? সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন কে, ইয়ন মরগ্যান না কেন উইলিয়ামস? ফাইনালে কে হবেন লর্ডসের লর্ড? ইয়ন মরগ্যান, জেসন রয়, জস বাটলার, জোফরা আর্চার নাকি কেইন উইলিয়ামসন, ম্যাচ হেনরি বা ট্রেন্ট বোল্টের কেউ?

প্রশ্নের শেষ নেই। কৌতূহল আর গুঞ্জনেরও কমতি নেই। স্বাগতিক ইংলিশ-ব্রিটিশদের বাড়তি উৎসাহ, উদ্দীপনা আর প্রাণচাঞ্চল্য এবং সাড়াশব্দ কম মনে হলেও লর্ডসের ফাইনাল নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে জল্পনা-কল্পনার কমতি নেই একটুও।

ইতিহাস জানাচ্ছে লর্ডসে অধিনায়কদের ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার রেকর্ড আছে এর আগে একজন মাত্র অধিনায়কের, তিনি ক্লাইভ লয়েড।

লর্ডসের ফাইনালে লড়াই হতে পারে দুদলের ব্যাটসম্যানদের। ব্যাটসম্যানের একটি ইনিংসই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।

১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে এই লর্ডসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অসাধারণ এক ম্যাচ জেতানো শতরান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রথম একদিনের ক্রিকেটে বিশ্বসেরার মুকুট উপহার দিয়েছিলেন তখনকার ক্যারিবীয় অধিনায়ক লয়েড। ৮৫ বলে এক ডজন বাউন্ডারি ও দুই ছক্কায় ১০২ রানের ইনিংসটিই ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বকাপ জয়ের মূল ভীত।

এর ঠিক চার বছর পর ১৯৭৯ সালে এই লর্ডসে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩৮ রানের ম্যাচ উইনিং ইনিংস খেলে ইংলিশদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে গুড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন ভিভিয়ান রিচার্ডস। ঐ আসরে অবশ্য রিচার্ডস অধিনায়ক ছিলেন না। প্রথমবারের মত ক্যারিবীয় ক্যাপ্টেন তখনও লয়েডই। তবে ফাইনালে ভিভ রিচার্ডসের ১৫৭ বলে ১১ বাউন্ডারি ও তিন ছক্তায় সাজানো ১৩৮ রানের অসামান্য ইনিংসটিই ব্যবধান গড়ে দিয়েছিল।

এরপর ১৯৮৩ আর ১৯৯৯ সালে এই লর্ডসের ফাইনালে কোন অধিনায়কই কিছু করতে পারেননি। ১৯৮৩ সালে ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ বিজয়ের নায়ক ছিলেন অলরাউন্ডার মহিন্দর অমরনাথ। ব্যাট ও বল হাতে সমান দক্ষতায় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড আর ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরপর ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন দিল্লীর ঐ চৌকস ক্রিকেটার। মহিন্দর অমরনাথের অমন চৌকস নৈপুণ্যের ওপর ভর করেই আসলে ভারত হয়েছিল ক্রিকেটে প্রথমবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন । ব্যাট হাতে ২৬ রান করার পর ১২ রানে ৩ উইকেট দখল করে ভারতের জয়ের নায়ক হন মহিন্দর।

বল হাতে ফার্গুসন-আর্চারদের লড়াইও হবে দেখার মতো।

এরপর ১৯৮৭ সালে কোলকাতার ইডেনে বিশ্বকাপ ফাইনাল সেরা হন অজি ওপেনার ডেভিড বুন। তার ১২৫ বলে করা ৭৫ রানের ইনিংসটির ওপর ভর করেই অস্ট্রেলিয়া পায় ২৫৩ রানে লড়িয়ে পুঁজি। এরপর ইংলিশ অধিনায়ক মাইক গ্যাটিংয়ের সামনে ছিল দলকে প্রথমবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার সুযোগ। কিন্তু ৪৫ বলে ৪১ রান করার পর নিজের ভুলে অজি অধিনায়ক অ্যালান বর্ডারের বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে নিজের পাশাপাশি দলের বিপর্যয় ডেকে আনেন গ্যাটিং। দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বসেরা হবার সুযোগ হারায় ইংল্যান্ড ।

১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে হিরো হবার বদলে উল্টো ভিলেন বনে যান তখনকার ইংলিশ ক্যাপ্টেন গ্রাহাম গুচ। ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরি করতে না পারলেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইমরান খানের দায়িত্বশীল ৭৪ রানের ইনিংসটির ওপরই আসলে গড়ে ওঠে ফাইনালের ভাগ্য।

অধিনায়ক গ্রাহাম গুচের হাতে স্কয়ার লেগ আর মিড উইকেটের মাঝামাঝি ক্যাচ আউটের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে ইমরান একপ্রান্ত আগলে রাখার পাশাপাশি রানের চাকা সচল করার কাজটিও করেছিলেন অসামান্য দক্ষতায়। শেষ পর্যন্ত তার ১১০ বলে ৭২ রানের ইনিংসটির ওপর ভর করেই পাকিস্তান পায় ২৪৯ রানের পুঁজি।

বল হাতে এক ওভারে পরপর দুই বলে দুই ইংলিশ অ্যালান ল্যাম্ব আর অলরাউন্ডার কিও লুইসের উইকেট উপড়ে ওয়াসিম আকরাম ম্যাচ সেরা হলেও ফাইনালে পাকিস্তানের জয়ের রুপকার আসলে অধিনায়ক ইমরান খান।

১৯৯৬ সালে লাহোরের গাদ্দাফী স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার অবিস্মরণীয় জয়ের নায়ক ও রুপকার ছিলেন অরবিন্দ ডি সিলভা। লঙ্কান ক্রিকেটের সব সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান অরবিন্দ ডি সিলভা ১২৪ বলে ১০৭ রানের হার না মানা ইনিংসটির ওপর ভর করেই অস্ট্রেলিয়ার ২৪১ রান টপকে প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় শ্রীলঙ্কা।

তিন বছর পর ১৯৯৯ সালেও দু দলের কোন অধিনায়ক সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারেননি। একতরফা ফাইনালে পাকিস্তান অলআউট হয়ে গিয়েছিল মাত্র ১৩২ রানে। ঐ রান টপকাতে আসলে অজিদের কারও বড়সড় কিছু করারও সুযোগ ছিল না। ৪ উইকেট (৩৩ রানে) শিকারী লেগস্পিনার শেন ওয়ার্ন হয়েছিলেন ম্যাচ সেরা।

২০০৩’এ দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ান্ডারার্সে ভারতের বিপক্ষে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিজয় কেতন ওড়ান তখনকার অজি অধিনায়ক রিকি পন্টিং। পন্টিংয়ের ৮ ছক্কা ও ৪ বাউন্ডারিতে ১২১ বলে করা ১৪০ রানের উত্তাল ইনিংসে লন্ডভন্ড হয়ে যায় জহির খান, জাভাগাল শ্রীনাথ, আশিষ নেহরা আর হরভাজন সিংয়ের গড়া ভারতীয় বোলিং।

পরের আসরের ফাইনালে রেকর্ড ৩৫৯ রানের পাহাড় সমান স্কোর গড়ে ১২৫ রানের বড় জয়ে অস্ট্রেলিয়া আবার হয়ে যায় বিশ্বসেরা। ২০০৭ সালে বার্বাডোজের কিংস্টন ওভালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মারকুটে অজি ওপেনার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের শতরানে উবে যায় শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন। অধিনায়ক রিকি পন্টিং থাকার পরও ওপেন করতে নামা গিলক্রিস্ট যে ৮ ছক্কা ও ১৩ বাউন্ডারিতে ১০৪ বলে ১৪৯ রানের ঝড়ো ইনিংসটি খেলেন, তাতেই গড়ে ওঠে ফাইনালের ভাগ্য।

২০১১ সালে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে অন্যতম ব্যাটিং নির্ভরতা মাহেলা জয়বর্ধনে সেঞ্চুরিতেও (৮৮ বলে ১০৩) শেষ রক্ষা হয়নি শ্রীলঙ্কার। ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির ৯১ রানের (৭৯ বলে) ম্যাচ জেতানো ইনিংসটিতেই গড়ে ওঠে ম্যাচ ভাগ্য। সবশেষ ২০১৫ সালের মেলবোর্নের ফাইনাল ছিল ম্যাড়ম্যাড়ে। নিউজিল্যান্ডকে ১৮৩ রানে গুড়িয়ে হেসে খেলে কাপ জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া।

ওপরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে আগের ১১ ফাইনালে সেঞ্চুরি হয়েছে মোট ৫টি। যার ৪টিতেই গড়ে উঠেছে ম্যাচ ভাগ্য। তার মাত্র দুটি করেছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড (১৯৭৫) আর রিকি পন্টিং ( ২০০৩ সালে)।

এখন এবার ফাইনালে কি হবে? ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দল জেতাবেন কে? কেন উইলিয়মাসন না ইয়ন মরগ্যান?

এবারের বিশ্বকাপের পারফরমেন্সকে মানদন্ড ধরলে এ লড়াইয়ে এগিয়ে কিউই ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসন। এবারের আসরে ৯ খেলায় দুই সেঞ্চুরি আর দুই হাফ সেঞ্চুরিতে ৫৪৮ রান করে রান তোলায় এখন পাঁচ নম্বরে উইলিয়ামসন। আর দল টেনে নেবার ক্ষেত্রে অধিনায়কদের মধ্যে এক নম্বরে।

সে তুলনায় ইংলিশ অধিনায়ক মরগ্যান পিছনে। ১০ ম্যাচে ১টি করে সেঞ্চুরি-হাফসেঞ্চুরিতে মরগ্যানের স্কোর ৩৬২। অবশ্য তিন ইংলিশ উইলোবাজ জো রুট (১০ ম্যাচে ৫৪৯ রান ২ সেঞ্চুরি, ৩ হাফসেঞ্চুরি), বেয়ারস্টো (১০ ম্যাচে ৫২৬ রান) আর জেসন রয় (৭ ম্যাচে ৪২৭ রান)) অধিনায়ক মরগ্যানের কাজ এগিয়ে দিচ্ছেন।

ফাইনালে দু’দলের এই ব্যাটসম্যানদের পাশাপাশি সবার চোখ আরও চারজনের দিকে। তারা সবাই ফাস্ট বোলার। একজন ইংলিশ; জোফরা আর্চার। বাকি তিনজন কিউই- ট্রেন্ট বোল্ট, ম্যাট হেনরি ও লকি ফার্গুসন। তিনজনই বল হাতে দুর্দান্ত পারফরম করেছেন। দলের ফাইনালে উঠে আসার পেছনে তাদের অবদানও প্রচুর।

ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত ফাস্ট বোলার আর্চার ১০ ম্যাচে ১৯ উইকেট নিয়ে উইকেট শিকারে তিন নম্বরে আছেন। ফাইনালের আগে তাকে নিয়েও অনেক কথাবার্তা। নিউজিল্যান্ডের ফার্গুসনও ১৮ উইকেট দখল করে আর্চারের তার ঘাড়েই নিঃশ্বাষ ফেলছেন। এছাড়া ট্রেন্ট বোল্ট পেয়েছেন ৯ ম্যাচে ১৭ উইকেট, ম্যাট হেনরি ৮ ম্যাচে ১৩ উইকেট।

দেখা যাক এদের কে হন এবারের ফাইনালের সেরা পারফরমার?

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন