রোজার আগে আবার বন্দর অচল করে দিল পুরনো সিণ্ডিকেট, বিএনপি এবার প্রকাশ্যে
নিত্যপণ্যের ৮০ জাহাজ অপেক্ষায়
আবার চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের বিএনপিপন্থী শ্রমিক-কর্মচারীরা। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচির ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের তিনটি টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামাসহ প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে এ কর্মসূচি শুরু হয়।

সকাল থেকে বন্দরের প্রধান জেটিগুলোতে থাকা ১২টি জাহাজ ও বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ৮০টিরও বেশি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে খালাস কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কনটেইনার পরিবহন ও ডেলিভারি কার্যক্রমও থেমে আছে। বন্দরের ভেতরে কোনো ধরনের ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন ঢুকতে দেখা যায়নি। পুরো এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সবমিলিয়ে অন্তত ৪০ হাজার কনটেইনার আটকা পড়েছে ইয়ার্ডগুলোতে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পরিচালনার ভার দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলসহ চার দফা দাবিতে এই কর্মসূচি দিয়েছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’। এর আগে ৩১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কাজ বন্ধ রাখেন শ্রমিকেরা। পরে গত মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হলে বন্দরে কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নৌপরিবহন উপদেষ্টার বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করা হয়। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। এর পরপরই রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা আসে।
বিএনপিও এবার প্রকাশ্যে
এরই মধ্যে বিএনপি তাদের শ্রমিক সংগঠনের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে বলেছে, ‘নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, প্রশ্নবিদ্ধ এবং জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী।’
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান এক যৌথ বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেছেন, ‘তড়িঘড়ি করে এই চুক্তি সম্পাদনের প্রচেষ্টা দেশের জনগণের মধ্যে গভীর সন্দেহ, উৎকণ্ঠা ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত এ সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।’
বন্দর সচল রাখতে হার্ডলাইনে সরকার
রমজান উপলক্ষে ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করতেই চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট চলছে বলে মনে করেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তবে বন্দর সচল রাখতে সরকার হার্ডলাইনে রয়েছে বলেও জানান তিনি। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘পোর্টে অচলাবস্থা তৈরি করছে পোর্টের কর্মচারী, নির্বাচনকে টার্গেট করেই এটি করছে। মানুষ সাফার করলে মানুষ বুঝবে। ডিপিওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি ফেবারেবল করলে সরকার করবে।’
নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মি রাখার চেষ্টা করছে কিছু লোক। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর সচল রাখতে হার্ডলাইনে আছে সরকার। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারাই বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রমজান উপলক্ষে ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করতেই এ ধর্মঘট চলছে। আন্দোলনকারীরা যেসব দাবিদাওয়া করছে তা মানার মতো না। কিন্তু রমজানকে সামনে রেখে যেকোনো মূল্যে চট্টগ্রাম বন্দর সচল রাখা হবে। চুক্তির বিষয়ে আরও সময় চেয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছে ডিপিওয়ার্ল্ড। নির্বাচনের পরেও এ বিষয়ে আলোচনা চলবে।
‘বন্দর হাইজ্যাক করা হয়েছে’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বন্দর ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিক্ষোভের ব্যানারে একাংশ কর্মচারী বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত করে কার্যত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি ‘হাইজ্যাক’ করেছে এবং জনস্বার্থকে জিম্মি করে রেখেছে।
তিনি বলেন, চলমান আন্দোলন এমন একটি প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা, যা এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তার ভাষায়, যারা এসব করছে তারা রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং রমজানের আগে জনমনে অসন্তোষ তৈরির পরিকল্পনা করছে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দর পরিচালনার প্রস্তাব নিয়ে তিনি বলেন, এখনো কোনো চুক্তি সই হয়নি। আইনি ও প্রক্রিয়াগত ধাপ শেষ না হলে কোনো চুক্তি কার্যকর হবে না। আদালতের নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, বন্দর সচল আছে। তিনি দুই ঘণ্টা ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সবাই কাজে যাবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।
বন্দর অচলের নেপথ্যে ১৫ জনের বলয়
সাধারণ শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে মোট ১৫ শ্রমিক নেতা। এদের তাদের মধ্যে কেউ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য, কেউ বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য হিসেবে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির এবং পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন। দুজনই চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক।
এ ছাড়া রয়েছেন পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন, রাশেদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবির, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী এবং যান্ত্রিক বিভাগের খালাসি মো. রাব্বানী।
তালিকায় আরও আছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি, প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়া এবং যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার আমিনুর রসুল বুলবুল।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
ধর্মঘটের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে উদ্যোগ নিতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে খোলা চিঠি দিয়েছে চার ব্যবসায়ী সংগঠন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) পাঠানো ওই চিঠিতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন উদ্বেগ জানায়।
চিঠিতে বলা হয়, বন্দরের বহির্নোঙরে বার্থিং ও পণ্য খালাস বন্ধের ঘোষণায় পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের ৯৯ শতাংশ কনটেইনার ও ৭৮ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে তৈরি পোশাকসহ সব প্রধান খাত অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল খালাস না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যা দ্রব্যমূল্য বাড়াবে। জাহাজ জট ও কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আমদানিকারকদের প্রতিদিন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ডেমারেজ চার্জ হিসেবে দিতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
ক্যাবের ক্ষোভ
অতি দ্রুত চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ক্রেতা ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ(ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগ ও নগর কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেছেন, আগামি ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে পারে রমজান মাস। রোজায় ব্যবহত ভোগ্যপণ্য আমদানি-মজুতে এবার ভালো অগ্রগতির আভাস ছিল। আশা করা হয়েছিল রমজানে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় মাত্রায় থাকবে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আবারো অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরদের নতুন অস্ত্র তুলে দিয়ে নিত্যপণ্য নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।’
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন, ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগরের প্রেসিডেন্ট জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, ক্যাব চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা প্রেসিডেন্ট আবদুল মান্নান, ক্যাব যুব গ্রুপ চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবু হানিফ নোমান স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করে বলেন, সপ্তাহের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে ভোগ্যপণ্যের চেইনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটবে। এতে ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরের মতো রমজানে ব্যবহায় নিত্য পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ানোর আরও একটি ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে চিচ্ছেন তথাকথিত আন্দোলনকারীরা। যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।
সিপি




