রেস্টুরেন্টে তুর্কি, ব্রিকফিল্ডে কফিল, তবু সাতকানিয়ার শাহাদাত হত্যা মামলায় আসামি
ঘটনাস্থলে না থেকেও আসামি আরও অনেকেই
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াত কর্মী মো. শাহাদাতকে (৩০) হত্যার ঘটনায় মামলায় আসামি হয়েছেন এমন কয়েকজন, যাঁরা ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন না বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাঁদের একজন তানভীর হোসেন তুর্কিকে রাত ১০টা ৪৬ মিনিট থেকে ১১টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত একটি রেস্টুরেন্টে দেখা গেছে ভিডিও ফুটেজে। আরেক আসামি কফিল উদ্দিন ঘটনার সময় ছিলেন কয়েক কিলোমিটার দূরে এসবিএম ব্রিক ফিল্ডে। তারপরও তাঁদের শাহাদাত হত্যা মামলার আসামি বানানো হয়েছে।
মামলায় দুই সহোদরসহ কয়েকজনকে আসামি করার পেছনে স্থানীয় রাজনীতির বিরোধ কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতে ইসলামীর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন মামলার বাদী নিহত শাহাদাতের মা ছায়েরা খাতুন ও আসামিদের পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যও প্রায় একই। তাঁদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের কারণে কয়েকজনকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
আর মামলার বাদী ছায়েরা খাতুনের ছেলে মোবারক হোসেনও কয়েকজনকে আসামি করার পক্ষে ছিলেন না বলে জানা গেছে। তাঁর সঙ্গে কফিল উদ্দিনের ফোনালাপে মামলার আসামি ঠিক করার বিষয়ে স্থানীয় নুরুল আলম মেম্বারের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। ওই কথোপকথনের রেকর্ড চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে এসেছে।
২৬ এপ্রিলের সেই হামলা
এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে সাতকানিয়ার রাস্তার মাথা এলাকায় নিজের দোকানের সামনে শাহাদাত হোসেনের ওপর হামলা হয়। মুখোশধারী ১৫ জনের একটি দল সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সেখানে আসে। তাদের হাতে ছিল হাতুড়ি, লোহার রড, হকিস্টিক ও লাঠি।
মারধরের একপর্যায়ে মামলার ১ নম্বর ও ২ নম্বর আসামি শাহাদাতের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। গুরুতর আহত শাহাদাতকে প্রথমে সাতকানিয়ার আশ শেফা বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে তাঁকে নগরের বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন ভোর সাড়ে ছয়টার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় শাহাদাতের মা ছায়েরা খাতুন বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় তানভীর হোসেন তুর্কি, কামাল উদ্দিন, সৈয়দ আহমদ, শাহাদাত হোসেন মিশলু, মো. ফারুক ওরফে ওমর ফারুক, মো. আকিব ওরফে আকিবুল ইসলাম, কফিল উদ্দিন, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. হেলাল ও মো. নোমানকে আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ৮ থেকে ১০ জনকে।
মামলার ১ নম্বর আসামি তানভীর হোসেন তুর্কি ৬ নম্বর আসামি কফিল উদ্দিনের ছোট ভাই।
শাহাদাতকে নিয়ে জামায়াতের বক্তব্য
নিহত মো. শাহাদাত সাতকানিয়ার ঢেমশা ইউনিয়নের মাইজপাড়া এলাকার মৃত শফি আহমদের ছেলে। বিবাহিত শাহাদাত চার সন্তানের জনক। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর উপজেলা জামায়াতের আমির কামাল উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘শাহাদাত জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। তিনি আমাদের কর্মসূচিতে সব সময় সক্রিয় ছিলেন। তাঁকে এভাবে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’
পিচ্চি কামালের সঙ্গে বিরোধ
অনুসন্ধানে জানা যায়, মামলার ২ নম্বর আসামি পিচ্চি কামালের সঙ্গে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা নিয়ে শাহাদাতের বিরোধ ছিল। কারাগার থেকে জামিনে আসার পরই শাহাদাতের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন কয়েকজনের নাম মামলায় আসার তথ্য পাওয়া গেছে, যাঁদের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কফিল উদ্দিন, তানভীর হোসেন তুর্কি, মো. হেলাল, সাইফুল ও ফারুকসহ কয়েকজন।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেছেন, তাঁরা ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
তানভীর হোসেন তুর্কি ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না, এমন ভিডিও ফুটেজও চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে এসেছে। রাত ১০টা ৪৬ মিনিট থেকে ১১টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত ফুটেজে তাঁকে একটি রেস্টুরেন্টে দেখা যায়। অথচ শাহাদাতের ওপর হামলার সময় ছিল রাত ১১টার দিকে। তবে তুর্কির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
১০টা থেকে ১২টা ব্রিক ফিল্ডে কফিল
মামলার ৬ নম্বর আসামি কফিল উদ্দিনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এসবিএম ব্রিক ফিল্ডে ছিলেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় মিজানুর রহমান।
মিজানুর রহমান বলেন, রাত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কফিল তাঁর সঙ্গে ব্যবসায়িক কাজে ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, কফিল ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাঁর সঙ্গে থাকা অবস্থায় কফিলের কোনো অস্বাভাবিক আচরণও দেখা যায়নি।
মিজানুর রহমানের দাবি, ‘গ্রাম্য রাজনীতির বলি হয়েছেন কফিল।’
নিয়াজুর রহমান মেম্বারও বলেন, ঘটনার সময় কফিল তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। মাটি সংক্রান্ত একটি সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন।
‘২৬ লাখ টাকা পাওনা ছিল শাহাদাতের’
মামলার বাদী ছায়েরা খাতুনের অভিযোগ, এক নারীর সঙ্গে ওই নেতার আপত্তিকর একটি ছবি তাঁর ছেলে শাহাদাতের মোবাইলে ছিল। ওই নেতার কাছে শাহাদাতের ২৬ লাখ টাকা পাওনা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ছায়েরা খাতুনের অভিযোগ, শাহাদাত হত্যার তিন মাস আগে মামলার ২ নম্বর আসামি পিচ্চি কামালকে মাদকসহ সেনাবাহিনী আটক করেছিল। কামালকে আটকের পেছনে শাহাদাতের ভূমিকা ছিল বলে সন্দেহ করা হতো। সেই সন্দেহ থেকেই তাঁর ছেলেকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই মামলা করতে শাহাদাতের পরিবারকে ওই নেতা চাপ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন ছায়েরা খাতুন।
‘কারা আসামি হবে, ঠিক করে দেন নুরুল আলম’
মামলার ৬ নম্বর আসামি কফিল উদ্দিনের সঙ্গে নিহত শাহাদাতের ভাই মোবারক হোসেনের সাম্প্রতিক একটি ফোনালাপ চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে এসেছে।
ওই কথোপকথনে মামলার এজাহারে কারা আসামি হবেন, তা স্থানীয় নুরুল আলম মেম্বার ঠিক করে দিয়েছিলেন বলে উঠে এসেছে। দ্রুত মামলা করার জন্য তিনিই চাপ দিয়েছিলেন বলেও কথোপকথনে বলা হয়।
ফারুকের সঙ্গে শাহাদাতের পরিচয়ই ছিল না
মামলার ৫ নম্বর আসামি মো. ফারুক ওরফে ওমর ফারুকের বাড়ি পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গায়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল কেরানীহাট। ফারুকের পরিবারের দাবি, শাহাদাতের সঙ্গে তাঁর কোনো চেনাজানাই ছিল না এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
পরিবারটির অভিযোগ, পূর্ব গাটিয়া ডেঙ্গা ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নেতা মোরশেদ আলমের তদবিরে ফারুককে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মোরশেদের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজি, মাদক সেবন ও বিক্রি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, কিশোর গ্যাং পরিচালনা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ফারুক একসময় মোরশেদের সঙ্গে কাজ করতেন। প্রায় দুই বছর আগে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মোরশেদ তাঁকে পিটিয়ে পা ভেঙে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ফারুককে এলাকায় যেতে দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেছে পরিবার।
পরিবারটির অভিযোগ, সেই ক্ষোভ থেকেই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ফারুককে শাহাদাত হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ হেলাল ও ইসমাইলের পরিবারের। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন এবং ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেও ছিলেন না। ষড়যন্ত্র করে তাঁদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
পুলিশের চোখে মূলহোতা পিচ্চি কামাল
সাতকানিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহবুব ইসলাম বলেন, মামলার ২ নম্বর আসামি পিচ্চি কামালই ঘটনার মূলহোতা। মামলায় নয়জনকে আসামি করা হলেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিন থেকে চারজন সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
কফিল উদ্দিনকে মামলায় আসামি করার বিষয়ে মাহবুব ইসলাম বলেন, মামলার ১ নম্বর আসামি তানভীর হোসেন তুর্কি তাঁর ছোট ভাই। তানভীরের বিরুদ্ধে একাধিক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ১ নম্বর আসামির ভাই হওয়ার কারণেই কফিল উদ্দিনকে শাহাদাত হত্যা মামলায় জড়ানো হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তবে তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে জানান তিনি।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, কফিল উদ্দিন উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর ৭ নম্বর আসামি মো. সাইফুল ইসলামও আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। ৮ নম্বর আসামি নোমান ও ৯ নম্বর আসামি হেলালও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসেছেন।
সিপি




