অন্য প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ও হোল্ডিং ব্যবহার করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে ৬৫ লাখ টাকার বেডিং ধোলাইয়ের কাজ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে তাদের দাখিল করা সব কাগজও ভুয়া। এ কাজে রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান কাজটি নিয়েছে, তাদের নিজস্ব কোনো কারখানা নেই। কাজ নিয়ে রেলের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা আরেকটি কারখানায় তারা ধোলাইয়ের কাজ করছে বলে জানা গেছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) জালিয়াতির অভিযোগ এনে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ নামে একটি ধোলাই প্রতিষ্ঠানের মালিক মোশারফ হোসেন ভুইয়া রেলের (পূর্ব) জিএম বরাবরে চিঠি দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক দপ্তর ১ম শ্রণির বেডিং ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। গত ২ জুলাই দরপত্র খোলা হলে ৫ প্রতিষ্ঠানের আবেদনের মধ্যে তিনটি শর্ত পূরণ না করায় ঝরে যায়। এরপর ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ও ‘এ আর কনস্ট্রাকশনের’ ৬৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার দরপত্র যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু মদিনা শালকর সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও এসএলটি পদ্ধতির দোহাই দিয়ে তাদের বাতিল করে ৩ লাখ টাকা বাড়তি খরচায় এ আর কনস্ট্রাকশনকে কাজটি দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক দপ্তর থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয় সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করে রিপোর্ট দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্যিক দপ্তরের জেটিআই এনামুল হক শিকদার।
১৭ বছর ধরে বেডিংয়ের কাজ করা মদিনা শালকরের স্বত্বাধিকারী মোশারফ হোসেন ভুইয়া এ বিষয়ে রেলের (পূর্ব) জিএম বরাবরে অভিযোগ দেন।
এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ মদিনা শালকরের স্বত্বাধিকারী মোশারফ হোসেন ভুইয়া বলেন, ‘১৭বছর এই কাজটি করেছি সুনামের সঙ্গে। ১ম সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরেও কেন আমাকে না দিয়ে ২য় সর্বনিম্ন দরদাতাকে দেওয়া হলো বোধগম্য নয়। এ জন্য আমি অভিযোগ জানিয়েছি।’
অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিন দেখা গেছে, ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে যে প্রতিষ্ঠানটি দরপত্র পেয়েছে সেটির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পশ্চিম মাদারবাড়ি, যুগিচাঁদ মসজিদ লেন ২ নম্বর গলি’। কিন্তু সেই ঠিকানায় রয়েছে ‘ফ্রেস ওয়াশ সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যেটির স্বত্বাধিকারী বিষ্ণু পাল আকাশ নামে এক ব্যক্তি। তিনি জায়গার মালিক কে এম মামুন রাজার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ব্যবসা চালিয়ে আসছে বলে জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির মিঠুন নামে এক ব্যক্তি ২ মাস আগে চাকরি নেন ফ্রেস ওয়াশ সেন্টারে। সেখানে থাকাবস্থায় তিনি মালিক বিষ্ণু পালকে ধোলাইয়ের কাজ এনে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ব্যবহার করে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে জাল চুক্তিনামা তৈরি করেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ভুয়া তৈরি করে রেলের দরপত্র কিনে আবেদন করেন।
‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী দেখানো হয়েছে ফাতেমা বেগম নামে এক নারীকে। সেখানে যে মুঠোফোন নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. শহীদ ওরফে কানা শহীদ নামে এক ব্যক্তির।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জানতে চাইলে মো. শহীদ বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানটি পান্না নামে এক ঠিকাদারের। আপনার নম্বর কেন দেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি জানেন না বলে জানান।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টারে কাজ নেওয়া মিঠুন মূলত ‘ভাই ভাই শালকর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির আইস ফ্যাক্টরি রোডের পুলিশ ব্যারাকের পেছনে রেলের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে। এ আর কনস্ট্রাকশনের নামে কাজ নিলেও মূলত ধোলাই ও ইস্ত্রির করা হয় এই ভাই ভাই শালকরে।
ভাই ভাই শালকর নামে ওই প্রতিষ্ঠাটির প্রতারণা নিয়ে এর আর আগেও চট্টগ্রাম প্রতিদিনে ‘রেলের চাদর-কম্বল ধোলাইয়ে ‘ভাই ভাই লন্ড্রি’র অভিনব প্রতারণা, শেষমেশ বাতিল!’—শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
পাহাড়তলীর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা তৌষিয়া আহমেদ বলেন, ‘রেলের তদন্তকারী কর্মকর্তার রিপোর্টের ভিত্তিতে কাজটি দেওয়া সুপারিশ করা হয়েছে। জালিয়াতি প্রমাণ হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (পূর্ব) সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিজে




