রেলের ৬৫ লাখের ধোলাইয়ের কাজে জালিয়াতি, কাগজে-কলমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবে ‘ভুয়া’

চট্টগ্রাম প্রতিদিনে নিউজের পর আবারও তদন্ত

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে প্রথম শ্রেণি কোচের বেডিং ধোলাইয়ের ৬৫ লাখ টাকার কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছে কর্মকর্তারা। কিন্তু ঠিকাদারের সেই ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানের হদিস মিলেনি।

প্রশ্ন উঠেছে, যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় ভুয়া, তারা কিভাবে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও রেলের কাজ পেয়েছে। কাজ দেওয়ার আগে রেল কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছিলেন কিনা। যদি করে থাকেন তাহলে কিভাবে এমন জালিয়াতি তাদের চোখে পড়েনি?

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার পক্ষে অতিরিক্ত সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (এডিটিও) আসিফ খান চৌধুরী ঠিকাদারের ঠিকানা পরিদর্শন করেন।

এর আগে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ না পাওয়া প্রসিদ্ধ মদিনা শালকরের স্বত্বাধিকারী মোশারফ হোসেন ভুইয়া অনিয়মের বিরুদ্ধে জিএম (পূর্ব) বরাবরে অভিযোগ দেন। জানা গেছে, এবার তাকে নানাভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন রেল কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, রেল কর্মকর্তারা ঠিকাদারের দেওয়া ঠিকানা পশ্চিম মাদারবাড়ি ২ নম্বর গলিতে যান। কিন্তু সেখানে ঠিকানা অনুযায়ী ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে প্রতিষ্ঠানটি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে ছিল ‘ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টারের স্বত্বাধিকারী বিষ্ণু পাল আকাশ বলেন, রেলওয়ে থেকে তদন্তকারী দল এসে আমার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। তারা ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এডিটিও আসিফ খান চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বেডিংয়ের কাজে জালিয়াতির অভিযোগ এনে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ নামে একটি ধোলাই প্রতিষ্ঠানের মালিক মোশারফ হোসেন ভুইয়া রেলের (পূর্ব) জিএম বরাবরে চিঠি দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক দপ্তর ১ম শ্রণির বেডিং ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। গত ২ জুলাই দরপত্র খোলা হলে ৫ প্রতিষ্ঠানের আবেদনের মধ্যে তিনটি শর্ত পূরণ না করায় ঝরে যায়। এরপর ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ও ‘এ আর কনস্ট্রাকশনের’ ৬৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার দরপত্র যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু মদিনা শালকর সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও এসএলটি পদ্ধতির দোহাই দিয়ে তাদের বাতিল করে ৩ লাখ টাকা বাড়তি খরচায় এ আর কনস্ট্রাকশনকে কাজটি দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক দপ্তর থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয় সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করে রিপোর্ট দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্যিক দপ্তরের জেটিআই এনামুল হক শিকদার।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ মদিনা শালকরের স্বত্বাধিকারী মোশারফ হোসেন ভুইয়া বলেন, ‘১৭বছর এই কাজটি করেছি সুনামের সঙ্গে। ১ম সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরেও কেন আমাকে না দিয়ে ২য় সর্বনিম্ন দরদাতাকে দেওয়া হলো বোধগম্য নয়। এ জন্য আমি অভিযোগ জানিয়েছি।’

অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিন দেখা গেছে, ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে যে প্রতিষ্ঠানটি দরপত্র পেয়েছে সেটির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পশ্চিম মাদারবাড়ি, যুগিচাঁদ মসজিদ লেন ২ নম্বর গলি’। কিন্তু সেই ঠিকানায় রয়েছে ‘ফ্রেস ওয়াশ সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যেটির স্বত্বাধিকারী বিষ্ণু পাল আকাশ নামে এক ব্যক্তি। তিনি জায়গার মালিক কে এম মামুন রাজার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ব্যবসা চালিয়ে আসছে বলে জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির মিঠুন নামে এক ব্যক্তি ২ মাস আগে চাকরি নেন ফ্রেস ওয়াশ সেন্টারে। সেখানে থাকাবস্থায় তিনি মালিক বিষ্ণু পালকে ধোলাইয়ের কাজ এনে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ব্যবহার করে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে জাল চুক্তিনামা তৈরি করেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ভুয়া তৈরি করে রেলের দরপত্র কিনে আবেদন করেন।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টারে কাজ নেওয়া মিঠুন মূলত ‘ভাই ভাই শালকর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির আইস ফ্যাক্টরি রোডের পুলিশ ব্যারাকের পেছনে রেলের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে। এ আর কনস্ট্রাকশনের নামে কাজ নিলেও মূলত ধোলাই ও ইস্ত্রির করা হয় এই ভাই ভাই শালকরে।

ভাই ভাই শালকর নামে ওই প্রতিষ্ঠাটির প্রতারণা নিয়ে এর আর আগেও ২০২৫ সালের ১৮ মে চট্টগ্রাম প্রতিদিনে ‘রেলের চাদর-কম্বল ধোলাইয়ে ‘ভাই ভাই লন্ড্রি’র অভিনব প্রতারণা, শেষমেশ বাতিল!’—শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

জেএস/ডিজে

ksrm