রেলের সাড়ে ৫ হাজার টিএলআরের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়, ঝুঁকিভাতা পান না গেটকিপাররা

বাংলাদেশ রেলওয়েতে মানবেতর জীবন পার করছেন অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিকরা (টিএলআর)। বেতনভাতা ঠিকমতো না পাওয়া, ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা, পদোন্নতি না পওয়াসহ বিভিন্ন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের। এক যুগ চাকরি করেও অনেকে এখনও স্থায়ী হতে পারেননি। রেলে এই ধরনের টিএলআরের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৫৮ জন। পূর্বাঞ্চলে কর্মরত আছেন দুই হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা গেটকিপারদের ঝুঁকিভাতা পর্যন্ত মেলে না।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে রেলের প্রকৌশল ও যান্ত্রিক দপ্তরেই গেটম্যান, ওয়েম্যান, অফিস সহায়ক, অস্থায়ী পি-ম্যান, ট্রলিম্যান, ওয়াইম্যানসহ বিভিন্ন পদে বছরের পর বছর কর্মরত হাজারেরও বেশি শ্রমিক বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তাদের চাকরি এখনও রাজস্বভুক্ত স্থায়ী হয়নি। বিশেষ করে গেটম্যানদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হলেও তারা কোনো ভাতা পান না।

রেলের তথ্য অনুযায়ী, রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন অস্থায়ী পদে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৫৫৮ জন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া প্রকল্পের গেটম্যান আছেন ১৮০০ জন আর আউটসোর্সিং হিসেবে কাজ করছেন ৩০০ টিএলআর। শুধুমাত্র দৈনিক কাজের ভিত্তিতে মজুরি পান তারা।

পূর্বাঞ্চলে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তার অধীনে চট্টগ্রামে ২২২ জন, সদর দপ্তরে ১ জন এবং ঢাকায় ২৬২ জনসহ মোট ৪৮৫ জন অস্থায়ী কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়া রেল পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে প্রকৌশল দপ্তরে ৮৪৩ জন অস্থায়ী রেলকর্মী কাজ করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে ৬১২ জন গেটকিপার এবং অন্যান্য পদে ২৩১ জন কর্মরত রয়েছেন।

জানা গেছে, রেল পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের প্রকৌশল দপ্তরে বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন-১)-এর অধীনে ৫৩ জন এবং বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিইএন-৩)-এর অধীনে ১৫৩ পদের বিপরীতে ১৩৯ জন কর্মরত রয়েছেন। সারাদেশে রেল পূর্বাঞ্চলেই অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ৮৪৩ জন, যার মধ্যে ৬১২ জন গেটকিপার এবং অপর ২৩১ জন অন্যান্য পদে কর্মরত।

রেলের একাধিক টিএলআরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক শ্রমিক বিভিন্ন পদে ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের এখনও পর্যন্ত স্থায়ী করা হয়নি। বেতনের বাইরে তারা কোনো ধরনের ভাতা পান না। এর মধ্যে বেতনও প্রতিমাসে ঠিক মতো পান না তারা।

যাদের সাপ্তাহিক বন্ধ শুক্র ও শনিবার তাদের মাসে ২২ দিনের বেতন দেওয়া হয়। আর যাদের বন্ধ শুধু শুক্রবার তাদের দেওয়া হয় ২৬ দিনের বেতন।

২০২২ সাল থেকে চাকরি স্থায়ীর করার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন টিএলআররা। ২০২৩ সালে তারা কয়েকবার ট্রেন অবরোধও করেন। কিন্তু সবাই আশ্বাস দিলেও পরে গিয়ে কোনো কাজ হয়নি। আগে রেলমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে বর্তমান রেলমন্ত্রীর কাছে তারা চাকরি স্থায়ীসহ বিভিন্ন দাবিতে স্মারকলিপি দেবেন বলে জানা গেছে।

টিএলআরদের দাবির মধ্যে রয়েছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বেতন-ভাতা ঠিকমতো পরিশোধ, ৩০ দিনের বেতন প্রদান, ইচ্ছেমতো চাকরিচ্যুত বন্ধ করা, ২০২০ সালের সংশোধনী নিয়োগ বিধিমালা বাতিল করা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে টিএলআর ঐক্য ফোরাম চট্টগ্রাম বিভাগের আহ্বায়ক মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অনেক সহকর্মী এক যুগ ধরে কাজ করলেও এখনও স্থায়ী হতে পারেননি। ফলে বেতনের বাইরে আমরা কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাই না। এ বিষয়ে আমরা আন্দোলন করে যাচ্ছি। অনেক সময় আমাদের অনেক সহকর্মীকে হুট করে চাকরিচ্যুত করা হয়। এতে করে তাদের পরিবার নিয়ে কষ্ট পোহাতে হয়। আমরা চাই, আমাদের স্থায়ী করে রাজস্বভুক্ত করা হোক।’

রেল পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘মতের পার্থক্য এবং আইনি জটিলতার কারণে অস্থায়ী রেল শ্রমিকদের সরাসরি নিয়োগ দেওয়া কঠিন। তবুও তাদের প্রতি আমরা সদয়। কর্মরতদের স্থায়ী করার উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক দিক।’

রেল পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অস্থায়ী গেটকিপারের সংখ্যা সমহারে থাকলেও এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা মনে নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে তারা কষ্ট করে রেলসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রেলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা উদ্যোগ নিলে বিষয়টি সহজ হবে।’

রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘অস্থায়ী চাকরিজীবীরা কঠোর পরিশ্রম করে রেলকে সচল রেখেছেন। বিশেষ করে গেটকিপারদের অবদান অসামান্য। তাই নিয়োগে প্রথমে গেটকিপারদের স্থায়ী করার চিন্তাভাবনা চলছে। তা সম্ভব না হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অস্থায়ী রেল শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করতে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা চলমান।’

ডিজে

ksrm