রেলের পথে এক মাসে ৫৫ ইঞ্জিন বিকল, ৫% কমিশন ও বেনামি ব্যবসায় যন্ত্রাংশ আমদানি থমকে

মাঝপথে সাতবার থেমে সাত ঘণ্টা বিলম্বে ট্রেন

চট্টগ্রাম ও ঢাকা রেলপথে গত এক মাসে চলন্ত অবস্থায় ৫৫টি ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনায় যাত্রীসেবায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি না করার কারণে সচল ইঞ্জিনও মাঝপথে অচল হয়ে পড়ছে। এতে ট্রেন চলাচলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্ব হচ্ছে, বাড়ছে যাত্রী ভোগান্তি। এই পরিস্থিতির নেপথ্যে রেলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেল সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা।

সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়ম: বেলালের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ
সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়ম: বেলালের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ

ইঞ্জিন সংকটে ফেব্রুয়ারিতে ঝুঁকি

রেল সূত্র জানায়, যন্ত্রাংশ আমদানি না হওয়ায় ফেব্রুয়ারিতে ইঞ্জিন অচলের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। চট্টগ্রাম প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি চট্টগ্রামের দপ্তর ছেড়ে ঢাকায় রেল ভবনে অস্থায়ী অফিসে অবস্থান করে কমিশন বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরঞ্জাম ক্রয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে।

সহকারী সরঞ্জাম কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে ওএসডি করা হলেও মূল দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিস্মিত অনেকে। রেল কর্মকর্তাদের মতে, ভুল তথ্য ও যন্ত্রাংশ আমদানি না করার কারণে ইঞ্জিন সংকট তীব্র হয়েছে। এডিজি রোলিং স্টক (আরএস) এই দায় এড়াতে পারেন না বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিসংখ্যানেই বাড়ছে উদ্বেগ

রেলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে সারা দেশে ইঞ্জিন ফেইলিউরের সংখ্যা ছিল ৫৫টি। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৩৭টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৬টি ঘটনা ঘটে। যন্ত্রাংশের অভাবে মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেনগুলো ১ থেকে ৭ ঘণ্টা দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছেছে। যাত্রীরা টাকা খরচ করে ভোগান্তি কেনার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন।

চলতি জানুয়ারির ১৩ তারিখ পর্যন্ত ১৩ দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৪টি ইঞ্জিন ফেইলিউরের ঘটনা ঘটে। ৭ জানুয়ারি পাহাড়িকা এক্সপ্রেস দীর্ঘ সময় বিকল থাকার ঘটনায় প্রায় সাত ঘণ্টা বিলম্ব হয়।

পাহাড়তলীতে অচল অর্ধেকের বেশি ইঞ্জিন

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল শপে সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন ১০টিসহ প্রায় ২৫টি ইঞ্জিন যন্ত্রাংশ সংকটে অচল হয়ে আছে। পাহাড়তলী ডিজেল শপের তথ্যে, মোট ইঞ্জিন রয়েছে ৯০টি। এর মধ্যে সচল মাত্র ৪৪টি। অর্থাৎ অর্ধেকেরও কম ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রীসেবা চালানো হচ্ছে।

পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মব্যবস্থাপক এহতেশাম বলেন, যন্ত্রাংশ এলেই বিকল ইঞ্জিনগুলো সচল করা যাবে।

প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান ইঞ্জিন সংকট বিষয়ে প্রশ্ন না করার অনুরোধ জানিয়ে নতুন ২০টি কোচ আমদানির শেষ চালান নিয়ে কথা বলেন।

যন্ত্রাংশ না থাকায় মেরামত থমকে

রেল সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে ইঞ্জিন ফেইলিউর বাড়ার পেছনে বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানি না করাই বড় কারণ। রেলে প্রায় এক হাজার নিবন্ধিত ঠিকাদার দেশি ও বিদেশি যন্ত্রাংশ ও পণ্য সরবরাহ করে। সাধারণত চাহিদার বিপরীতে মজুদ রাখা হয়। কিন্তু স্টক শেষ হওয়ার পরও চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় নতুন ১০টিসহ প্রায় ২৫টি ইঞ্জিন মেরামত করা যাচ্ছে না।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

পাহাড়িকার ঘটনায় ক্ষোভ

৬ জানুয়ারি রাত ১০টায় সিলেট থেকে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। পথে সাতবার বিকল হয়ে মেরামতের পর ট্রেনটি প্রায় সাত ঘণ্টা বিলম্বে দুপুর ১টার দিকে চট্টগ্রামে পৌঁছায়। ভোর সাড়ে ৫টায় পৌঁছানোর কথা ছিল ট্রেনটির।

অনলাইনে টিকিট কেটে প্রায় দুই শতাধিক যাত্রী সকালে প্রবাল এক্সপ্রেসে কক্সবাজার যাওয়ার কথা ছিল। পাহাড়িকা এক্সপ্রেস দেরিতে পৌঁছানোয় তারা ট্রেন মিস করেন। ক্ষুব্ধ যাত্রীরা চট্টগ্রাম স্টেশন ম্যানেজারের কক্ষে গিয়ে অভিযোগ জানান। সমাধান না পেয়ে উত্তেজিত যাত্রীরা তিনটি কোচের জানালার কাচ ভাঙচুর করেন।

আমদানি নিয়ে ব্যাখ্যা

ঢাকা রেল ভবনের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) বোরহান উদ্দিন বলেন, যন্ত্রাংশ আমদানির বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। সমুদ্রপথে যন্ত্রাংশ আসতে সময় লাগবে এবং তা এপ্রিল মাসে পৌঁছাতে পারে।

বছরে বরাদ্দ ২৫০ কোটি টাকা

রেল প্রকল্পের বাইরে বছরে প্রধান সরঞ্জাম দপ্তরের জন্য বরাদ্দ থাকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। যন্ত্রাংশ ক্রয়, ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল সরবরাহে সিসিএসের জন্য বরাদ্দ থাকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। সিওএস ও ইনভেন্টরিতে ২৫ কোটি করে মোট ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

কার দায়ে আমদানি থমকে

এডিজি রোলিং স্টক আরএসের অধীন প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর চট্টগ্রাম। মালামাল ক্রয়, সংগ্রহ ও গুদামজাত করার দায়িত্ব তাদের। সূত্র জানায়, সিসিএস বেলাল সরকারের ভুল তথ্য ও ডিপোর মালামাল সংক্রান্ত তথ্য গোপনের কারণে আমদানি প্রক্রিয়া থেমে যায়। এডিজি ও ডিজির মধ্যে সমন্বয়হীনতায় রেল ভবনের শীর্ষ পর্যায়ে সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলেন, সহকারী সরঞ্জাম কর্মকর্তা শরিফুল আওয়ামী ঘরানার ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের ছেলে, সিসিএস সাবেক রেলমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ, ডিজি আফজাল হোসেন এক ধরনের অবস্থানে এবং এডিজি মাহবুব কবিরকে কেউ কেউ জামায়াতপন্থি আবার কেউ বিএনপিপন্থি বলে উল্লেখ করেন।

সিসিএস বেলাল সরকারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বেলালের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

রেলের সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মো. বেলাল হোসেন সরকার। রাজশাহীতে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পশ্চিম) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ক্রয়কার্যে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে প্রাক্কলন অনুমোদন, প্রতিযোগিতামূলক OTM পদ্ধতি বাদ দিয়ে LIM পদ্ধতিতে ক্রয়, এবং LTM টেন্ডার নোটিশ মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পাঠিয়ে অধিকাংশ ঠিকাদারকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে তিনি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট করেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, তালিকাভুক্ত ১৭৯ জন ঠিকাদারের মধ্যে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নোটিশ পাঠানো হয়। অবশিষ্ট ১৭৩ জন ঠিকাদার, এমনকি দপ্তরের নোটিশ বোর্ডেও নোটিশ প্রকাশ করা হয়নি। টেন্ডারকারী তথা HOPE হিসেবে তিনি সোফাসেট ও স্টিলের চেয়ারের মতো পণ্য মানসম্মতভাবে গ্রহণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখেননি। এতে সরকারি ক্রয় আইনের যথাযথ অনুসরণ হয়নি এবং দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মেলে।

তদন্ত শেষে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলেও তার দায়িত্বহীনতা ও অবহেলাকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে রেলপথ মন্ত্রণালয় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পরবর্তী এক বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়। ১৮ জুন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের সই করা প্রজ্ঞাপনে এ দণ্ড অবিলম্বে কার্যকরের কথা জানানো হয়।

যা বললেন এডিজি

অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহম্মেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, সহকারী সরঞ্জাম কর্মকর্তা শরিফুলের বদলির সুপারিশ তিনবার করা হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। তিনি বলেন, ডিপো স্টক ও চাহিদাপত্রে স্বচ্ছতা ছিল না। মালামাল ক্রয় ও সংরক্ষণে সঠিক ধারণা প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর থেকে পাওয়া যায়নি।

তিনি দাবি করেন, ৩ শতাংশ নয়, ১ শতাংশ কমিশন নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি স্বেচ্ছায় দপ্তর বদলির আবেদন করেছিলেন, তবে তা গ্রহণ করা হয়নি। সূত্র বলছে, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্যক্তিগতভাবে সৎ হলেও তার নাম

কমিশনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৩% নয়, ১% কমিশনও নিই, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না।

সূত্র বলছে, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্যক্তিগতভাবে সৎ হলেও তার নাম ভাঙিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে ধারণা রয়েছে।

সিপি

ksrm