রাতে চবির চলন্ত শাটলে ছাত্রীকে যৌন হয়রানি, রুদ্ধশ্বাস ধস্তাধস্তি

এবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চলন্ত শাটল ট্রেনে বহিরাগত বখাটের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ছাত্রী।

বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) রাত সোয়া সাতটার দিকে চলন্ত শাটল ট্রেনে এই ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, আমি বৃহস্পতিবার আমি ক্যাম্পাস থেকে সাড়ে পাঁচটার শাটলে সামনে থেকে ৩/৪ নং বগিতে উঠি । একই বগিতে এক দাদুমতো লোক, অন্য এক আঙ্কেলমতো লোক উঠেছিলেন। সময়মতো ট্রেন না ছাড়ায় অন্য লোকেরা দোকানে ইফতার করতে গিয়েছে। আমি ট্রেনে বসে করেছি। ইফতারের পর অন্য লোকেরা আর এই বগিতে উঠেননি।

ইফতারের পর নতুন দুইজন ছেলে বগিতে উঠে। তারা একে অপরকে বলছিলো, “ট্রেন ছাড়বে না, বাসে যাই চল”। এরপর একজন প্রথমে একবার আমাকে ফোনের লাইট দিয়ে দেখে চলে যায়। পরে আবার এসে জিজ্ঞেস করে, আপু আপনি কোথায় যাবেন? বললাম, কেন? বললো, ট্রেন ছাড়বে না। বললাম, তো? বললো, ট্রেন ছাড়বে না তাই বললাম আর কি।

ছেলেটা চলে গেলো। অপরজন তাকে নিচু স্বরে বলছে, মেয়ে মানুষ..! তুই জিজ্ঞেস করতে গেলি কেন?…

এরপর সাতটায় ট্রেন ছেড়েছে। ছেলেটি বগির এপাশ ওপাশ হাঁটাহাঁটি করছে। এক এক জায়গায় বসছে। আমার মুখে লাইট পড়লো কয়েকবার। জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কি বহিরাগত? ছেলেটি বুঝলো না কথাটা। বললাম, আপনারা এখানকার স্টুডেন্ট নয় না? বললো, আমরা বহদ্দারহাট থেকে আসছি।

এরপর ট্রেন একটি স্টেশনে থামলো। আবার চলতে শুরু করলো। আমি কিছুক্ষণ ফোন ঘেঁটে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসেছিলাম। চলন্ত ট্রেনে হঠাৎ, কেউ একজন এসে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে একহাতে আমার মুখ এবং অপর হাতে আমার মাথা চেপে ধরে। সাথে সাথেই আমি চিৎকার করি এবং হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে মাটিতে পড়ে যাই। চোখের সামনে মৃত্যু দেখছিলাম। তখনও মুখে হাত দিয়ে চেপে ধরা এবং আমি প্রাণপণে হাত এবং কনুই দিয়ে ঠেলে বিকট শব্দে চিৎকার করতে থাকি। হঠাৎ তার হাত ফসকে যেতেই আমার চিৎকার বাইরে যাচ্ছিলো। তখনই কোথাও যেন পালিয়ে গেল। আমি জানালা দিয়ে হাত, মাথা বের করে চিৎকার করতে থাকি। দুইদিকেই তাকিয়ে ডাকতে থাকি। থামান, প্লিজ থামান এটাই বলতে থাকি। এক পাশের বগিতে এক ছোট ছেলে শুনে চিৎকার করে থামাতে বলে। কিন্তু হায়! ট্রেনের শব্দের সাথে আমাদের শব্দ মিলিয়ে যায়। অপর পাশের বগি থেকে দরজায় এসে এক ছেলে কিছু একটা বলছে। বললো, কী হয়েছে? আমি শুধু চিৎকার করে বলতে থাকি, “প্লিজ, এখানে আসুন। এখানে কতগুলো ছেলে…, এখানে আসুন, এখানে কতগুলো ছেলে…, এখানে আসুন, থামাতে বলুন।” ছেলেটিও চিৎকার করে বলে, আসছি, এখন ট্রেন স্লো হবে, একটু অপেক্ষা করুন। আমি বললাম, কখন স্লো হবে? প্লিজ আসুন, এখনই আসুন, এখানে ওরা আছে। ছেলেটি বলে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, এখনই ট্রেন থামবে, একটু পরেই স্টেশন। এরপর ছেলেটি আমাকে এভাবে আরও অনেক কিছু বলছিলো, বন্ধুকে বললো ওদের ধরতে এবং ওদের উদ্দেশ্য করে গালি দিচ্ছিলো। আমি চিৎকার করেই যাচ্ছিলাম। গলা ফেটে যাচ্ছিলো।

একটু পর ট্রেন স্লো হলে ছেলেগুলো আসলো। ফোনের লাইট জ্বালালো। সেখানে খুঁজে কাউকে পেলো না। বললো, কোথায় গেল ওরা? আমি আস্তে আস্তে বললাম, মনে হয় জানালা দিয়ে উঠে ছাদ দিয়ে অন্য বগিতে গেছে। তারা সেখানে দেখলো এবং কাউকেই পেলো না। ছেলেগুলো আমাকে জিজ্ঞেস করলো কী ঘটেছে, আমি ঠিক আছি কি না, এবং সান্ত্বনা দিচ্ছিলো।

আমি তখন হাঁফাতে হাঁফাতে ক্লান্ত। সারা মুখ অবিরত জ্বলছে। মনে হচ্ছে রক্ত ঝরছে। আমি ছেলেগুলোকে বললাম, দেখুন তো একটু আমার মুখে কী হয়েছে। তারা বললো, মুখে আঁচড় লেগেছে এবং ঠোঁট ফেটে গেছে, সম্ভবত আপনার দাঁতের চাপে।

তখনও ট্রেন চলন্ত। একজন এসে মুখের রক্ত মুছে দিল আমার বোতলের পানি দিয়ে। জিজ্ঞেস করলো, কোন ইয়ার, ডিপার্টমেন্ট, কোথয় যাব। আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, আপনারা কারা? তারা বললো, আমরা আপনার ভার্সিটির না। এদিকের কলেজের স্টুডেন্ট।

আমি ষোলশহর নামব বললাম। ছেলেগুলো আমার ব্যাগ নিয়ে আমাকে নামিয়ে দিল, তারাও নামল, একটি বসার জায়গায় বসিয়ে ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসলো। সেখান থেকে আমি বাড়ি চলে এলাম।

বাড়িতে এসে দেখি আমার মুখের বিভিন্ন জায়গায় নখের ছোট, বড়ো লাল আঁচড়, চোখের ঠিক উপরে কালো, সেখানে সুঁই ফোটানোর মতো অনুভব হচ্ছে এবং চোখের কোণায় ফুলে ব্যথা, গলা বসে গিয়েছে, মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত।

এমআইটি/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!