রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে রমজান মুমিনের দুয়ারে কড়া নাড়াতে শুরু করেছে। সেই আগমনী সুর নিয়েই আরবি বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস পবিত্র রজব হাজির। রজব ও শাবান—এই দুই মাসকে কেন্দ্র করেই মূলত রমজানের প্রস্তুতির সূচনা হয়। ইবাদত, সংযম ও আত্মশুদ্ধির দীর্ঘ অনুশীলনের প্রথম ধাপ এই সময় থেকেই শুরু করার তাগিদ দেয় ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
রজবের মর্যাদা ও ইতিহাস
পবিত্র রজব আল্লাহতায়ালার বিশেষ অনুগ্রহের মাস হিসেবে বিবেচিত। গুনাহ মাফ ও আত্মসংযমের অনুশীলনে এই মাসের গুরুত্ব আলাদা। ইসলামের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে রজবের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসেই মেরাজে গমন করেন। হজরত নূহ (আ.) মহাপ্লাবনের আশঙ্কায় রজব মাসেই কিস্তিতে আরোহণ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সর্বপ্রথম ওহি অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনাও রজব মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বর্ণনায় এসেছে।
আরবি চান্দ্রবর্ষের সপ্তম মাস রজব। ‘রজব’ শব্দের অর্থ সম্মানিত। জাহেলি যুগেও আরবরা এ মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিত। ইসলাম আগমনের পর আল্লাহতায়ালা ১২ মাসের মধ্যে চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম’ হিসেবে ঘোষণা করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২টি, যার মধ্যে চারটি সম্মানিত ও নিষিদ্ধ মাস। সূরা তওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই চার মাস হলো জিলকদ, জিলহজ, মুহাররম ও রজব।
হাদিসে রজবের গুরুত্ব
হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ যেদিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকেই সময়ের যে বিন্যাস নির্ধারিত ছিল, তা আবার ফিরে এসেছে। বছরে ১২ মাস, এর মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ ও সম্মানিত। এর মধ্যে তিনটি পরপর—জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম, আর একটি হলো জমাদিউস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস রজব।
ইমাম আবু বকর জাসসাস (রহ.) বলেছেন, এই সম্মানিত মাসগুলোতে ইবাদতে যত্নবান হলে বছরের বাকি সময় ইবাদত সহজ হয়। একইভাবে এ সময় গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারলে অন্য মাসগুলোতেও সংযম বজায় রাখা সহজ হয়।
রজবের দোয়া ও কবুলিয়ত
হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রজব মাস শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি দোয়া পড়তেন—‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজাবাও ওয়া শাবানা ওয়া বাললিগনা ইলা শাহরি রমাদান’। এর অর্থ, হে আল্লাহ, আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, পাঁচটি রাতে বান্দার দোয়া আল্লাহতায়ালা ফিরিয়ে দেন না। এর মধ্যে রয়েছে রজবের প্রথম রাত, জুমার রাত, শাবানের ১৫ তারিখের রাত, ঈদুল ফিতরের রাত ও ঈদুল আজহার রাত।
রজব, শাবান ও রমজানের ধারাবাহিকতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রজব আল্লাহর মাস, শাবান তাঁর মাস এবং রমজান তাঁর উম্মতের মাস। হজরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন, রমজান ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) সবচেয়ে বেশি রোজা রাখতেন শাবান মাসে, এরপর রজব মাসে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, তিনি রজবে প্রায় ১০টি, শাবানে ২০টি এবং রমজানে ৩০টি রোজা রাখতেন।
হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেছেন, রজব হলো ফসল বপনের মাস, শাবান সেচের মাস আর রমজান ফসল কাটার মাস। রজবকে তিনি বাতাসের সঙ্গে, শাবানকে মেঘের সঙ্গে আর রমজানকে বৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রজব মাসে ইবাদত ও প্রস্তুতি
প্রিয় নবী (সা.) রজব থেকেই রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। রজব ও শাবান মাসে তিনি নফল রোজা ও ইবাদতে অধিক সময় কাটাতেন। হজরত মুসা ইবনে জাফর (আ.) থেকে বর্ণনায় এসেছে, কেউ রজব মাসে একদিন রোজা রাখলে সে এক বছর জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পায়। তিন দিন রোজা রাখলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, রজব জান্নাতের একটি ঝর্ণাধারার নাম, যার পানি দুধের চেয়েও সাদা ও মধুর চেয়েও মিষ্টি।
ইসলামি ইতিহাসে রজব মাসের তাৎপর্য গভীর। হিজরি পঞ্চম বর্ষে এই মাসেই মুসলমানরা হাবশায় প্রথম হিজরত করেন। নবম হিজরির রজবে মুসলমানরা ত্যাগ ও কোরবানির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। চতুর্দশ হিজরিতে সিরিয়ার রাজধানী বিজয় এবং পঞ্চদশ হিজরিতে ইয়ারমুকের যুদ্ধও এই মাসে সংঘটিত হয়।
রমজানের প্রস্তুতিতে করণীয়
রজব ও শাবান মাসকে কেন্দ্র করেই রমজানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশনা পাওয়া যায়। তওবা ও ইস্তিগফার, পাপ বর্জন, নেক আমলে অভ্যস্ত হওয়া, সমাজে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের পরিবেশ গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রমজানে ইবাদতের পরিবেশ বজায় রাখতে শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের চাপ কমানো, দান-খয়রাত বৃদ্ধি এবং গরিব মানুষের সাহরি ও ইফতার নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত।
রজব মাসে ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি নফল রোজা ও নামাজ আদায়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা, আইয়ামে বিজের রোজা এবং তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, আওয়াবিনসহ অন্যান্য নফল নামাজ আদায়ের কথা বর্ণনায় এসেছে।
আত্মশুদ্ধির আহ্বান
রজব ও শাবান মাসে ধারাবাহিক ইবাদতের মধ্য দিয়েই রমজানের জন্য আত্মা ও মনকে প্রস্তুত করার শিক্ষা দেয় ইসলাম। এই প্রস্তুতির মাধ্যমেই রমজানের ইবাদত হয় প্রশান্তিময় ও ফলপ্রসূ। আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন রজব ও শাবানে বরকত দান করে রমজান পর্যন্ত পৌঁছার এবং রমজানের ফজিলত অর্জনের তৌফিক দেন।
লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট




