যৌন হয়রানির অভিযোগ ঘিরে এনসিপিতে নতুন মোড়, চট্টগ্রামের দুই নেতার কাছে জবাব চাইল কেন্দ্র

তদন্ত শুরুর আগেই ‘পক্ষাবলম্বন’

চট্টগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নারী কর্মীর যৌন হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হয়েছে। অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় অভিযুক্ত নেতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব ও সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটি।

যৌন হয়রানির অভিযোগ ঘিরে এনসিপিতে নতুন মোড়, চট্টগ্রামের দুই নেতার কাছে জবাব চাইল কেন্দ্র 1

শনিবার (২০ জুন) এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য মোহাম্মদ উসামা স্বাক্ষরিত পৃথক নোটিশে তাঁদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অবস্থান

নোটিশে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এ এস এম সুজাউদ্দীনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটির কাছে উত্থাপিত হয়। একই দিন কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের নির্দেশে অভিযোগ তদন্ত এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তিন সদস্যের তদন্ত ও শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করা হয়।

অভিযোগটি তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব দলীয় প্যাডে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্তের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

একই অভিযোগের পাশাপাশি সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তদন্তাধীন বিষয়ে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের আগেই পক্ষাবলম্বন এবং অভিযোগকারীকে অত্যন্ত হীন ভাষায় আক্রমণ করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়, এসব কর্মকাণ্ড দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটির প্রধানের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা পাঠাতে বলা হয়েছে।

যৌন হয়রানির অভিযোগ থেকে শুরু

গত শুক্রবার (১৯ জুন) চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ির একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপির এক নারী কর্মী অভিযোগ করেন, জাতীয় নারী শক্তির কমিটি গঠনসংক্রান্ত বৈঠকের কথা বলে গত ১৪ জুন তাঁকে নগরের জিইসি মোড়ের পেনিনসুলা হোটেলের রুফটপ বারে ডেকে নেওয়া হয়।

তাঁর অভিযোগ, সেখানে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন, জাতীয় নারী শক্তির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব সাদিয়া আফরিন এবং আরও দুজন পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। নারীশক্তির কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে কোনো আলোচনা না করে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদ, চাকরি ও আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তরুণীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে সাদিয়া আফরিন স্থান ত্যাগ করলে সুজা উদ্দিন তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেন, অনৈতিক প্রস্তাব দেন এবং ‘ডিল অর ডেথ’ বলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে তিনি স্থান ত্যাগ করেন।

এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার (১৭ জুন) চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ওই নারী। একই সঙ্গে দলীয় আহ্বায়কের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেন। পরে এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ বিষয়টি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।

সাইবার বুলিং ও পরিবারকে হেয় করার অভিযোগ

এদিকে সংবাদ সম্মেলনের পর নিজের বিরুদ্ধে সংগঠিত সাইবার বুলিং, কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ এবং পরিবারকে জড়িয়ে অপমানের অভিযোগ তুলে পৃথক লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন অভিযোগকারী নারী।

তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিনসহ তাঁর অনুসারী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে অপমানজনক, কুরুচিপূর্ণ ও নারীবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করছেন। তাঁর দাবি, এটি শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং তাঁকে ন্যায়বিচারের দাবি থেকে সরিয়ে দিতে, সামাজিকভাবে হেয় করতে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি সংগঠিত প্রয়াস।

লিখিত অভিযোগে তিনি আরও বলেন, তাঁকে অপমান করার পাশাপাশি তাঁর মা ও বোনকে নিয়েও অশালীন ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ‘নর্তকী’ এবং ‘টাকার বিনিময়ে কাজ করানো’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে পরিবারের নারী সদস্যদের মর্যাদাহানির চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগকারী বলেন, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কথা বলা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু একজন ভুক্তভোগী নারীকে ন্যায়বিচারের দাবি তোলার কারণে অপমান, গালাগাল, চরিত্রহনন, সাইবার বুলিং এবং পরিবারকে জড়িয়ে হেয় করা কোনো সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিনি দাবি করেন, চলমান এই প্রচারণার কারণে তিনি ও তাঁর পরিবার চরম মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক হেয়প্রতিপন্নতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।

এনসিপি নেতাদের কাছে পাঁচ দাবি

লিখিত বক্তব্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং ও মানহানিকর বক্তব্যদাতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তদের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপমানজনক বক্তব্যের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে কোনো নারী যাতে প্রতিশোধমূলক অপমান ও চরিত্রহননের শিকার না হন সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং ও অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে দলের ঘোষিত অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত লড়াই নয়; এটি নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক পরিসরে নারীর সম্মানজনক অবস্থান এবং ভুক্তভোগী নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের সঙ্গে জড়িত। দ্রুত দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তিনি আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণসহ বিষয়টি নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলা অব্যাহত রাখবেন বলেও উল্লেখ করেন।

সিপি

ksrm