যুবলীগের এক ফারুকেই ধরাশায়ী পুলিশের দুই কর্মকর্তা

0

বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না সন্দ্বীপের আলোচিত সৌরভ হত্যা মামলার ঘটনায়। এবার এই মামলার চার্জশিট দেওয়ার ঠিক আগে খোদ তদন্ত কর্মকর্তাকেই বদলি করে দেওয়া হল হঠাৎ। এর আগে আলোচিত এই মামলার রহস্য উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এক উপপরিদর্শককেও (এসআই) বদলি করা হয়েছিল আচমকা।

সন্দ্বীপজুড়ে আলোচিত এই মামলা প্রসঙ্গে সন্দ্বীপ উপজেলা যুবলীগের করা সংবাদ সম্মেলনের পর পরই নাটকীয়ভাবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সন্দ্বীপ থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আব্দুল হালিমকে বদলির ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে এই মামলার জের ধরে সন্দ্বীপ থানার দু’জন কর্মকর্তা বদলির ঘটনা ঘটলো। নাটকীয়ভাবে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বদলির ক্ষেত্রে জড়িয়ে যাচ্ছে উপজেলা যুবলীগ নেতা ওমর ফারুকের নাম।

১১ মার্চ আব্দুল হালিমের বদলির অফিস আদেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বদলির আদেশ অনুযায়ী নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে সন্দ্বীপ থানা ত্যাগ করেন আব্দুল হালিম। তাকে সন্দ্বীপ থানা থেকে চন্দনাইশের ধোপাছড়ি তদন্ত কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ফারুককে গ্রেফতারের ঘটনায় গত ৬ মার্চ সৌরভ হত্যামামলা নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে সন্দ্বীপ উপজেলা যুবলীগ। সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিদ্দিকুর রহমানের একটি বক্তব্যের অডিও রেকর্ড চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে এসেছে। সেখানে ছিদ্দিকুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে থানার যিনি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে আছেন… অফিসার ইনচার্জ… আজ থেকে কয়দিন আগে উনি নিজে বলছেন, আপনারা (যুবলীগ) এই ব্যাপারে একটু ইয়া করেন। উনি (ইন্সপেক্টর তদন্ত) নিজের ইচ্ছামত এগুলা করতাছেন। আসলে ফারুক এখানে জড়িত নয়।….. ওদের মধ্যে দেখি যে দ্বিমত আছে।’

এ সংবাদ সম্মেলনের এক সপ্তাহের মধ্যে নাটকীয়ভাবে বদলি হলেন তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল হালিম।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওমর ফারুককে ফাঁসানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল হালিম বলেন, ‘আসামি রাব্বি গত বছরের ২২ ডিসেম্বর তারিখে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে ওমর ফারুকের নাম এসেছে। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফারুককে জড়ানোর সুযোগ নেই। এই স্বীকারোক্তির বিষয়ে ওসি স্যারও জানতেন।’

অন্যদিকে ছিদ্দিকুর রহমানের বক্তব্যে ‘ওসির বরাত দিয়ে কিছু করতে বলার’ বিষয়ে জানতে চাইলে সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ শরিফুল আলম বলেন, ‘আমি ছিদ্দিকুর রহমানকে এই ধরনের কোন কথা বলিনি। এটা আপনি লিখবেন না। আমার কিছু জানাতে হলে উপরমহলে জানাবো, উনাকে কেন বলবো?’

এদিকে, যুবলীগের সংবাদ সম্মেলন ও এর পেছনে ওসির ইন্ধন প্রসঙ্গে মামলার তদন্ত নিয়ে আবারও শঙ্কার কথা জানাচ্ছে সৌরভের স্বজনরা। তারা বলছেন, এই মামলায় এক আসামিকে ঘিরে পর পর দু’জন কর্মকর্তা বদলির ঘটনা ঘটলো। এর আগেও এই মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। শুরু থেকেই এই মামলার বিষয়ে অনেক মহল থেকে চাপ ছিল। যুবলীগের সংবাদ সম্মেলনের পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বদলি তাদেরকে হতাশ করেছে। মামলার সঠিক তদন্তের বিষয়ে তারা শঙ্কিত।

এমনকি এই মামলার জের ধরে সন্দ্বীপ থানার একজন উপপরিদর্শকেও বদলি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সৌরভের স্বজনরা। তারা বলেন, এই মামলার প্রাথমিক তদন্তে উপপরিদর্শক হেলাল খুব সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। মূল রহস্য উদঘাটনে তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

জানা গেছে, ১৬৪ ধারায় ফারুকের নাম আসার পর তাকে গ্রেফতারে উপপরিদর্শক হেলালসহ পুলিশের একটি দল ফারুকের বাড়িতে গিয়েছিল, তার পরপরই হেলালকে সন্দ্বীপ থানা থেকে মিরসরাই থানাতে বদলি করে দেওয়া হয়।

তবে এ বিষয়ে এসআই হেলাল চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের ভাই বদলির চাকরি। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।’

একই ধরনের বক্তব্য সদ্য বদলি হওয়া পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল হালিমেরও। চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘পুলিশের চাকরিতে বদলি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। সৌরভ হত্যামামলার সাথে এই বদলির কোন সম্পর্ক নাই।’

এ বিষয়ে কথা বলতে চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (সীতাকুন্ড সার্কেল) শম্পা রানী সাহার মোবাইলে কল করে তাকে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের পরিচয় দিতেই তিনি ‘রং নাম্বার’ বলে কল কেটে দেন। এরপর তার মোবাইলে কল করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে জেলা পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি।

গত ২৩ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সৌরভ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ওমর ফারুক (৩২) প্রকাশ কালা ফারুককে সাভার থেকে গ্রেপ্তার করে সন্দ্বীপ নিয়ে আসেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সন্দ্বীপ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল হালিম। এই মামলায় রাব্বী নামে এক আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ফারুকের নাম থাকায় তাকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ওদিনই ফারুককে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে ফারুকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফারুকের ঘরে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। ফারুকের ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া সৌরভের মোবাইল ও লুঙ্গির অংশবিশেষও উদ্ধার করে পুলিশ।

এসএ//সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন