মেয়াদ ২০২৪ থেকে, নাকি ২০২১: কতদিন চট্টগ্রাম সিটির মেয়র থাকবেন শাহাদাত?

আদালতের রায়, গেজেট ও আইনের সংঘাত

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান পর্ষদের পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মেয়রের পদ নিয়ে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ঘোষিত শাহাদাত হোসেন দাবি করছেন, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবরের আদালতের রায় থেকে তার নতুন পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরু হয়েছে। কিন্তু আদালতের রায়ের ভাষা, নির্বাচন কমিশনের গেজেট, স্থানীয় সরকার আইনের বিধান এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠি এ সব কিছু একটিই কথা বলছে, মেয়রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে দুই মাস চার দিন আগে, চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি। মেয়াদ শেষের পরও মেয়র হিসেবে শাহাদাতের দেওয়া আদেশ ও অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে এক অভূতপূর্ব আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত কোনো অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বা নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করে, তবে এই সংকট আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে, যা চট্টগ্রামের নগর প্রশাসনকে দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ে আটকে ফেলবে।

আদালতের রায়ের পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট প্রকাশিত হয়।
আদালতের রায়ের পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট প্রকাশিত হয়।

এদিকে এমন পরিস্থিতিতেও স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে বিস্ময়কর নীরবতা পালন করে চলেছে। চট্টগ্রাম প্রতিদিনের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি।

একটি নির্বাচন, চার বছরের মামলা, তারপর রায়

২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী নৌকা প্রতীকে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী ঘোষিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শাহাদাত হোসেন পান মাত্র ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট। ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি সরকারি গেজেটে ফল চূড়ান্ত করা হয়।

চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো চিঠিতে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে: ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের ১ম সভা ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। ধারা ৬ অনুযায়ী কর্পোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত হবে।’
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো চিঠিতে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে: ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের ১ম সভা ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। ধারা ৬ অনুযায়ী কর্পোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত হবে।’

কিন্তু পরাজিত প্রার্থী শাহাদাত হোসেন ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি দাবি করেন, ব্যাপক কারচুপি, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের মাধ্যমে রেজাউল করিম চৌধুরীকে অন্যায়ভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রায় তিন বছর আট মাস পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর বিচারক মোহাম্মদ খাইরুল আমীনের চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল রায় দেন। রায়ে রেজাউল করিম চৌধুরীর ‘নির্বাচিত ঘোষণা’ বাতিল করে শাহাদাত হোসেনকে বিজয়ী মেয়র ঘোষণা করা হয়। রায়ের পর ৮ অক্টোবর ২০২৪ নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট প্রকাশিত হয় এবং ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনও জারি হয়।

মেয়াদ ২০২৪ থেকে, নাকি ২০২১: কতদিন চট্টগ্রাম সিটির মেয়র থাকবেন শাহাদাত? 1

এরপর থেকেই শুরু হয় বিতর্ক। শাহাদাত হোসেনের মেয়াদ কখন থেকে গণনা হবে? ২০২১ সাল থেকে, নাকি ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে? মেয়াদ কি ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে গেছে, নাকি ২০২৯ পর্যন্ত চলবে?

চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্ষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়র শাহাদাত হোসেন তার পদ ছাড়তে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, আদালতের রায়ে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে নতুন পাঁচ বছরের জন্য তাকে মেয়র ঘোষণা করা হয়েছে এবং তার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালে।

মেয়াদ শেষের পরও মেয়র হিসেবে শাহাদাতের দেওয়া আদেশ ও অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে এক অভূতপূর্ব আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
মেয়াদ শেষের পরও মেয়র হিসেবে শাহাদাতের দেওয়া আদেশ ও অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে এক অভূতপূর্ব আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

আদালতের রায়: ভাষার গভীরে কী লেখা?

বিচারক খাইরুল আমীনের রায়ের আদেশাংশে দুটি পৃথক উপধারা ব্যবহার করা হয়েছে। বিধিমালার ৫৯(খ) ধারা অনুযায়ী রেজাউল করিম চৌধুরীর নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল করা হয়েছে। ৫৯(ক) ধারা অনুযায়ী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ের ভাষায় বলা হয়েছে ‘বিগত ২৭/০১/২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মেয়র হিসাবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল করা হলো’ এবং ‘ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র হিসাবে ঘোষণা করা হলো।’

লক্ষণীয় যে, এই রায়ে ২০২৪ সাল থেকে নতুন পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরুর কোনো ভাষা নেই। রায়টি মূলত ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল সংশোধন করেছে এবং রেজাউলের পরিবর্তে শাহাদাতকে সেই নির্বাচনের বিজয়ী ঘোষণা করেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার হলো নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি করা অর্থাৎ কে প্রকৃত বিজয়ী তা নির্ধারণ করা। ট্রাইব্যুনাল নতুন মেয়াদ সৃষ্টি করতে পারেন না। যখন আদালত বললেন শাহাদাত ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী, তার অর্থ তিনি সেই মেয়াদের মেয়র, নতুন কোনো মেয়াদের নন।’

চট্টগ্রাম বারের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘এখানে আদালত পুরো দায়িত্বকালকে আলাদাভাবে অবৈধ বলেননি, বরং নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণাটিকেই বাতিল করেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।’ তার ব্যাখ্যায়, ‘রায়টি মূলত ফলাফল সংশোধন, নতুন নির্বাচন নয়।’

রেজাউলের দায়িত্বকাল কি ‘অবৈধ’ ঘোষিত হয়েছে?

রায় বিশ্লেষণ করে আইনবিদরা মতপ্রকাশ করেছেন, এটি একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন। রায়ে রেজাউল করিম চৌধুরীর নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তার প্রায় সাড়ে তিন বছরের দায়িত্বকালকে সরাসরি ‘অবৈধ’ বা ‘শূন্য’ ঘোষণা করা হয়নি।

তারা বলছেন, রেজাউল একটি বৈধ গেজেটের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে সেই গেজেট বাতিল হলেই তার পুরো দায়িত্বকাল পূর্বব্যাপি অবৈধ হয়ে যায় না। রায়ে ‘নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল’ মানে ভোটের ফলাফল পরিবর্তন। কিন্তু প্রশাসনিক দিক থেকে ‘ডি ফ্যাক্টো’ ডকট্রিন অনুযায়ী, তিনি দায়িত্বে থাকাকালীন বাজেট পাস, উন্নয়ন কাজ, চুক্তিসহ যেসব নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ করেছেন, সেগুলো জনস্বার্থে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না।

নির্বাচন কমিশনের গেজেট: কী বলছে সংশোধনী?

আদালতের রায়ের পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন প্রশাসন শাখা একটি ‘সংশোধিত গেজেট’ প্রকাশ করে। ওই গেজেটে বলা হয়েছে: ‘৩১ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রকাশিত গেজেটে… রেজাউল করিম চৌধুরীর পরিবর্তে শাহাদাত হোসেনের নাম ও দলের নাম প্রতিস্থাপন করা হলো।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘প্রতিস্থাপন’ শব্দটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গেজেটটি নতুন কোনো ঘোষণা নয়। এটি ২০২১ সালের গেজেটেরই সংশোধনী। অর্থাৎ আইনগতভাবে শাহাদাত হোসেন ২০২১ সালের নির্বাচনের বিজয়ী হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন, ২০২৪ সালে নতুন একটি মেয়াদ পেয়েছেন বলে নয়।

চট্টগ্রাম বারের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘গেজেটে ‘প্রতিস্থাপন’ শব্দের ব্যবহার খুবই সুচিন্তিত। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ২০২১ সালের নির্বাচনেরই ফলাফল পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন কোনো নির্বাচন হয়নি, নতুন মেয়াদও সৃষ্টি হয়নি। শাহাদাত হোসেন ২০২১ সালের নির্বাচনের মেয়র হিসেবে স্বীকৃত, সেই মেয়াদেরই বাকি অংশ তিনি পালন করতে পারবেন।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেজাউল করিম চৌধুরী ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে তিন বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবরের রায়ের সময় পর্ষদের স্বাভাবিক মেয়াদের মাত্র কয়েক মাস বাকি ছিল। এই পরিস্থিতিতে শাহাদাত হোসেন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু গেজেট বা মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রজ্ঞাপনেই বলা হয়নি যে শাহাদাতের মেয়াদ ২০২৪ থেকে নতুন করে পাঁচ বছর শুরু হবে। বরং প্রশাসনিক নথিপত্র ঠিক উল্টোটাই জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা

চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন নির্বাচন কমিশনে যে চিঠি পাঠিয়েছেন, সেটি এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দলিল হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। ওই চিঠিতে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে: ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের ১ম সভা ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। ধারা ৬ অনুযায়ী কর্পোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত হবে।’

সেই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ধারা ৩৪ অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একইসাথে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের এই চিঠি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালকে মেয়াদ শুরুর ভিত্তি ধরেনি। তারা ২০২১ সালের প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর গণনা করে ২০২৬ সালে নির্বাচনের কথা বলছে। এটি শাহাদাত হোসেনের দাবিকে সম্পূর্ণ খণ্ডন করে।

আইনের ধারা ৬: মেয়াদ গণনার একমাত্র মানদণ্ড

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯-এর ধারা ৬ অনুযায়ী, কর্পোরেশনের মেয়াদ গণনা শুরু হয় প্রথম সভার তারিখ থেকে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পর্ষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। আইন অনুযায়ী সেখান থেকে পাঁচ বছর গণনা করলে মেয়াদ শেষ হয় ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। এই আইনে কোথাও বলা নেই যে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমে নতুন মেয়র ঘোষিত হলে নতুন করে পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরু হবে। এই ধরনের ব্যাখ্যার কোনো আইনি ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তাহলে রেজাউলের দায়িত্বকাল কি ‘অবৈধ’ ঘোষিত হয়েছে?

আইনবিদরা বলছেন, রায়ের আদেশে বিধিমালার ৫৯(খ) ধারা ব্যবহার করে শুধু ‘নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল’ করা হয়েছে। রেজাউল করিম চৌধুরীর ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্বকালকে সরাসরি ‘অবৈধ’, ‘শূন্য’ বা ‘বাতিল’ ঘোষণার কোনো ভাষা রায়ে নেই।

রেজাউলের জায়গায় কি সরাসরি শাহাদাত?

চট্টগ্রাম প্রতিদিনের প্রশ্নের জবাবে আইনবিদরা বলেছেন, ‘হ্যাঁ, শাহাদাতকে বসানো হয়েছে। তবে ২০২১ সালের নির্বাচনের বিজয়ী হিসেবে। রায়ের স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা ২০১০-এর ৫৯(ক) ধারায় আদেশ এবং ৮ অক্টোবর ২০২৪-এর গেজেট উভয়ই স্পষ্টভাবে বলছে, শাহাদাত হোসেন ২৭ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী। ২০২১ সালের গেজেটে রেজাউলের নামের পরিবর্তে শাহাদাতের নাম প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যা ২০২১ সালের মেয়াদেরই ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। আদালত এবং নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট উভয় ক্ষেত্রেই ‘প্রতিস্থাপন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

তাদের ভাষ্যমতে, ‘আদালতের রায়ে শাহাদাতকে ‘২৭ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এটি ২০২১ সালের একটি পূর্ববর্তী নির্বাচনের ফলাফল সংশোধন, ভবিষ্যৎ মেয়াদ সৃষ্টি নয়। সুতরাং শাহাদাত হোসেনের যে যুক্তি, রায়ের তারিখ থেকে নতুন মেয়াদ শুরু হয়েছে, আইনের কোনো বিধান, রায়ের কোনো ভাষা বা প্রশাসনিক কোনো দলিল সমর্থন করে না।’

তবে কি শাহাদাত এখনও মেয়র থাকতে পারেন?

আইন, গেজেট ও মন্ত্রণালয় তিনটিরই প্রসঙ্গ টেনে আইনবিদরা বলছেন, এটা তিনি পারেন না। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা বলেন, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ অনুযায়ী প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর এবং এটি অপরিবর্তনীয়। এখানে ব্যক্তির মেয়াদ নয়, বরং ‘পর্ষদ’ বা ‘কর্পোরেশন’-এর মেয়াদের কথা বলা হয়েছে। খোদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিকে মেয়াদের শেষ দিন নির্ধারণ করেছে। আদালত কোথাও বলেননি যে ২০২৬ সালের পরও শাহাদাত মেয়র থাকবেন।’

আইনবিদরা বলছেন, ‘যেহেতু চসিকের বর্তমান পর্ষদের প্রথম সভা ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাই পুরো পর্ষদের মেয়াদ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আইনত সমাপ্ত হয়েছে। শাহাদাত হোসেন যেহেতু ওই পর্ষদেরই একজন সদস্য (মেয়র), তাই পর্ষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তার মেয়াদও শেষ হবে। আইনের নতুন কোনো ব্যাখ্যা বা বিশেষ আদেশ ছাড়া ২০২৬ সালের পর তার পদে থাকার সুযোগ নেই।’

মেয়াদ কি ২০২৪ থেকে নতুনভাবে শুরু, নাকি ২০২১ থেকে?

চট্টগ্রাম প্রতিদিনের প্রশ্নের জবাবে আইনবিদরা বলেছেন, ‘না। মেয়াদ ২০২১ সালের প্রথম সভার তারিখ থেকেই গণনা হবে। এখানে তিনটি উৎস একমত: প্রথমত, সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এর ধারা ৬ বলছে মেয়াদ শুরু হয় প্রথম সভা থেকে। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রণালয়ের চিঠি ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিকে ভিত্তি ধরে মেয়াদ গণনা করেছে। তৃতীয়ত, আদালতের রায় ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তন করেছে, নতুন মেয়াদ সৃষ্টি করেনি। তাছাড়া নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিতে সীমাবদ্ধ। নতুন মেয়াদ সৃষ্টির ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের নেই এবং রায়ে এমন কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি।’

আইনি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শাহাদাত হোসেন নতুন কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে মেয়র হননি। বরং ২০২১ সালের ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে তাকে যে পরাজিত দেখানো হয়েছিল, আদালত সেই ‘ভুল’ বা ‘জালিয়াতি’ সংশোধন করে তাকে ‘বিজয়ী’ ঘোষণা করেছেন। যেহেতু তিনি ২০২১ সালের নির্বাচনের বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে গেজেটে প্রতিস্থাপিত হয়েছেন, তাই তিনি ওই পর্ষদের মেয়াদের বাকি অংশটুকুই পূরণ করবেন। ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরু হওয়ার কোনো আইনি বিধান সিটি কর্পোরেশন আইনে নেই।

আইন বনাম দাবি

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের মেয়াদ নিয়ে চলমান বিতর্কে আইন, গেজেট ও প্রশাসনিক দলিল একটিই উত্তর দিচ্ছে, তার মেয়াদ ২২ ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে। আদালতের রায় ২০২১ সালের একটি নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি করেছে মাত্র, নতুন পাঁচ বছরের মেয়াদ দেয়নি। নির্বাচন কমিশনের গেজেট ২০২১ সালের গেজেট সংশোধন করে শাহাদাতের নাম প্রতিস্থাপন করেছে, নতুন মেয়াদ সৃষ্টি করেনি। এ কারণেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সুস্পষ্টভাবে ২০২৬ সালে নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধও করেছে।

শাহাদাত হোসেনের দাবিমতো ২০২৪ সাল থেকে নতুন পাঁচ বছর আইনের ভাষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আইনগতভাবে টেকসই নয় বলে একাধিক আইনবিদ মতপ্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, শাহাদাতের দাবির সপক্ষে রায়ের কোনো ভাষা নেই, আইনের কোনো বিধান নেই এবং প্রশাসনিক কোনো স্বীকৃতিও নেই।

শাহাদাতের শেষ দাবি

পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষের পরদিন শাহাদাত হোসেন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ‘রেজাউল করিম চৌধুরীর যে মেয়াদ, তা পুরোটাই অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। তাই যেদিন থেকে তিনি শপথ নিয়েছেন, সেদিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ তার। অর্থাৎ ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বরের আগে মেয়াদ শেষ হবে না। আর সরকার তাকে যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দিয়েছে, তার মেয়াদও পাঁচ বছরের, দেড় বছরের নয়। তাই পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।’

যুক্তি ‘আইনগতভাবে অর্থহীন’

বিষয়টি নিয়ে একজন জ্যেষ্ঠ আইনবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘রায়ের আদেশে ঠিক কী লেখা আছে সেটি দেখুন, ‘মেয়র হিসাবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল করা হলো।’ আদালত ‘নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল’ করেছেন, কিন্তু রেজাউলের সমগ্র দায়িত্বকালকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেননি। আইনের ভাষায় এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল মানে ২০২১ সালের নির্বাচনী ফলাফল ভুল ছিল, প্রকৃত বিজয়ী শাহাদাত ছিলেন। দায়িত্বকাল অবৈধ মানে হতো রেজাউলের তিন বছরের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি চুক্তি বাতিল, যা রায়ে বলাই হয়নি এবং বললে চট্টগ্রামের পুরো পৌরপ্রশাসন আইনি শূন্যতায় পড়ে যেতো। আদালতের রায়ে ‘অক্টোবর ২০২৪ থেকে পাঁচ বছর’ এমন কোনো বাক্য বা এই অর্থবাহী কোনো ভাষাই নেই।’

‘নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলে পদত্যাগ করবো’— শাহাদাত হোসেনের এমন বক্তব্যকে আইনগতভাবে সমস্যাজনক এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করে ওই আইনবিদ বলেন, ‘এটা বলার অর্থ হলো মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পদে থাকার বিষয়টিকে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপার হিসেবে উপস্থাপন করা, যা আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। আইন বলছে মেয়াদ শেষ হয়েছে। পদত্যাগ এখানে অনুগ্রহ বা বিবেচনার বিষয় নয়। এটি আইনি বাধ্যবাধকতা।’

তিনি বলেন, ‘যদি শপথের তারিখ থেকে পাঁচ বছর ধরা হয়, তাহলে ধরুন কোনো নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল মামলা ১০ বছর ঝুলে থাকল এবং রায় হলো। তাহলে কি সেই বিজয়ী ঘোষিত ব্যক্তি আরও পাঁচ বছর পাবেন? এই যুক্তি মেনে নিলে যেকোনো নির্বাচনী মামলা যত দীর্ঘ হবে, বিজয়ী তত বেশি সুবিধা পাবেন, যা স্পষ্টতই আইনের উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে।’

‘কূটনৈতিক পাসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ বছর দেওয়া হয়েছে’— এমন যুক্তিকে ‘আইনগতভাবে অর্থহীন’ উল্লেখ করে ওই আইনবিদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘পাসপোর্ট একটি ভ্রমণ দলিল। এটি কোনো সাংবিধানিক বা আইনি মেয়াদের প্রমাণপত্র নয়। আইনের দৃষ্টিতে পদের মেয়াদ নির্ধারিত হয় সংবিধান ও আইনের বিধান অনুযায়ী, পাসপোর্টের মেয়াদ দিয়ে নয়।’

সিপি

ksrm