চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হালদা নদীর ওপর নির্মাণাধীন পাঁচপুকুরিয়া-সিদ্ধাশ্রম সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি মাসেই। কিন্তু ৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই সেতুটি চালু না হওয়ায় সুন্দরপুর ও সুয়াবিল ইউনিয়নসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রতিদিন ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় ‘গ্রামীণ সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ এর অধীনে ২৪০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ২১ জানুয়ারি। ৩০ মাস মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ ২০২৬ সালের ২০ জুলাইয়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় শেষে সেতুটি এখনো অসমাপ্ত।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাহের অ্যান্ড ব্রাদার্স। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কার্যাদেশ পাওয়ার প্রায় এক বছর পর চূড়ান্ত নকশা হাতে পাওয়ায় নির্মাণকাজে বড় ধরনের বিলম্ব হয়েছে। অথচ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কার্যাদেশ দেওয়ার আগেই নকশা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকার কথা।
এছাড়া সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণও এখনো শেষ হয়নি। এসব কারণে প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, পাইল, পাইল ক্যাপ, পিয়ার ও পিয়ার ক্যাপের কাজ শেষ হলেও গার্ডার সংযোগ, ডেক স্ল্যাব, স্টিলের কাঠামো, দুই পাশের সংযোগ সড়ক, নদী প্রতিরক্ষা ব্লক, বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জাসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি কাজ এখনো বাকি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. শাহিন বলেন, অর্থসংকট নয়, প্রকল্পে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নকশা। কার্যাদেশ পাওয়ার প্রায় এক বছর পর চূড়ান্ত নকশা হাতে পাই। এছাড়া সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়া, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণেও কাজ ব্যাহত হয়েছে। তাই প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি, ২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত প্রায় ১৯ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি রয়েছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা।
সেতুটি চালু না হওয়ায় সুন্দরপুর, পূর্ব সুয়াবিল, পাঁচপুকুরিয়া, চাঁদেরঘোনা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষকে বিবিরহাট কিংবা নাজিরহাট যেতে প্রায় ১৫ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে যাতায়াতে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে। পাশাপাশি প্রতিজনের পরিবহন ব্যয়ও ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজম বলেন, কবে এই সেতুর কাজ শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। প্রতিদিন ঘুরে যেতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
হালদা পাড়ের বাসিন্দা মো. ফারুক ও আপন নাথ বলেন, সেতুটি চালু হলে পুরো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু নির্মাণকাজের ধীরগতি দেখে মনে হচ্ছে, এটি শেষ হতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংবাদকর্মী সাইফুর রহমান সোহান বলেন, এটি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু কাজের ধীরগতিতে এখন মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কার্যাদেশ জারির দুই মাস সাত দিন আগেই তৎকালীন সংসদ সদস্য সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর পক্ষে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান এইচএম আবু তৈয়ব সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। সে সময় এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়সীমার দ্বিগুণেরও বেশি সময় পার হলেও সেতুটি এখনো গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।
উপজেলা প্রকৌশলী জুনায়েদ আবছার চৌধুরী বলেন, সেতুর মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। এখন নদীর ওপরাংশ এবং দুই পাশের সংযোগ সড়কের কাজ বাকি রয়েছে। আমরা আশা করছি, দ্রুতই কাজ শেষ হবে।
এদিকে প্রকল্পের অগ্রগতি, নকশা অনুমোদনে বিলম্ব এবং নির্ধারিত সময়েও কাজ শেষ না হওয়ার কারণ জানতে চট্টগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামাল উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
ডিজে




