মেট্রোপলিটন হাসপাতালের ‘ভুল চিকিৎসা’য় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের মৃত্যু

মা জানেন না ছেলেটা বেঁচে নেই

1

এবার ভুল চিকিৎসায় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠেছে নগরীর মেট্রোপলিটন হাসপাতালের বিরুদ্ধে। ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে মারা যাওয়া ছাত্রের নাম সজীব সেন। তিনি মা-বাবার একমাত্র সন্তান।

ছেলের মৃত্যু হলেও খবরটা জানেন না সজীবের মমতাময়ী মা। ছেলে লাইফ সাপোর্টে আছে— এই সংবাদেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। বারবার মূর্ছা যাওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে তারও ঠাঁই হয়েছে ন্যাশনাল হাসপাতালের কেবিনে।

এদিকে স্বজন হারানোর শোকের কোনও সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন না আত্নীয়-স্বজন কিংবা সহপাঠীরাও। এমনকি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষকরাও। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি ভুল চিকিৎসা নয়, হার্ট অ্যাটাকের কারণেই মৃত্যু হয়েছে সজীবের।

শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র সজীব সেনের অকাল মৃত্যুতে এভাবেই শোকের ছায়া নেমে আসে নিহতের পরিবারে।

সজীবের পরিবার এবং সহপাঠীদের অভিযোগ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘ভুল চিকিৎসা এবং অব্যবস্থাপনার’ কারণেই নিভে গেল এমন প্রাণোচ্ছল তরুণের জীবন প্রদীপ।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘ভুল চিকিৎসা এবং অব্যবস্থাপনার’ অভিযোগ
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘ভুল চিকিৎসা এবং অব্যবস্থাপনার’ অভিযোগ
Yakub Group

সজীবের বাবা সুজিত সেন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিল সজীব। শনিবার (২১ ডিসেম্বর) তাকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের শরণাপন্ন হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। তারপর ওই দিন দুপুরে তাকে ভর্তি করানো হয় হাসপাতালটির ৩১২ নম্বর কেবিনে।

সজীবের পরিবার জানায়, ওইদিন বিকাল ২টার দিকে চিকিৎসকদের পরামর্শে একজন নার্স তাকে নেবুলাইজার ও একটি ইনজেকশন পুশ করেন। অথচ তখনও মোবাইল হাতে নেট ব্রাউজিংয়ে ডুবে ছিল সজীব। কিন্তু ইনজেকশন ও নেবুলাইজার দেওয়ার দুই মিনিট না যেতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন সজীব। মুহূর্তেই কালো হয়ে যায় তার হাত-পা ও মুখ। নিচে পড়ে যায় তার হাতে থাকা ব্রাউজিংয়ের মোবাইলটিও।

এরপর কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে তাড়াহুড়া করে নিয়ে যান ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ)। সজীবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডেকে আনার অনুরোধ জানান পরিবার। তারপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডা. ইলিয়াসকে রোগীর আশঙ্কাজনক অবস্থার বিষয়টি জানান। তবে দুপুর ২টার দিকে চিকিৎসক ইলিয়াসকে বিষয়টি জানানো হলেও তিনি আসেন ৪ ঘন্টা পর— সন্ধ্যা ৬টার দিকে। ইতোমধ্যে সজীবের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। এরপর ২২ ডিসেম্বর চিকিৎসদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠনের পর নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শিউলি মজুমদার রোগীর স্বজনদের সজীবের শারীরিক অবস্থার অবনতির বিষয়টি পরিস্কার করেন।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, ওই রাতে শিক্ষার্থীরা ভুল চিকিৎসার প্রতিবাদ জানান। এ সময় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুষদের চেয়ারম্যান তানজিনা আলম চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন। যদিও তানজিনা আলম চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে ‘ভুল চিকিৎসার বিষয়টি’ জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

রাত বাড়ার পর নিহত সজীবের বাবা সুজিত সেনকে ডেকে কৌশলে হাসপাতাল ছাড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে কর্তৃপক্ষ। এরপর কোনও উপায় খুঁজে না পেয়ে ওই রাতেই হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) অ্যাম্বুলেন্স করে অ্যাপোলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রোববার ঢাকায় রওনা হয়।

পরিবারের অভিযোগ, চট্টগ্রাম থেকে ফোনে অ্যাপোলো হাসপাতালের কেবিন বুকিং নিশ্চিত করা হলেও সেখানে পৌঁছানোর পর সজীবের শারীরিক অবস্থা গুরুতর দেখে কেবিন খালি না থাকার অজুহাতে তাকে ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর ২২ ডিসেম্বর ভোর ৪টার দিকে তাকে ভর্তি করানো হয় ঢাকা বিআরবি হাসপাতালে। সেখানে সজীব প্রায় ৭দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) ভোরে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন সজীব।

এ বিষয়ে জানতে মেট্টোপলিটন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ফজলুল হকের মুঠোফোনে একাধিক ফোন করেও সাড়া মেলেনি। পরে হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৫-৬ ঘন্টা পরেই হার্ট অ্যাটাক করেছিল সজীব। তবে চাপ প্রয়োগ করে ‘রিলিজ’ দেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। সজীব এখানে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তার কয়েক’শ সহপাঠী এই হাসপাতালেই ছিল। এতো মানুষের সামনে চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।’

তবে এ বিষয়ে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষকদের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের (শিক্ষকদের) কথা হয়েছে। সবকিছু ঠিক আছে।’

এএ/এসএ

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm