মায়ের সংগ্রাম থেকে সমুদ্রজয়, কক্সবাজারের ফাতেমার ‘নতুন স্বপ্ন’
দেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসে
সাগরের উত্তাল ঢেউ, চোখের আড়ালে থাকা ভয়ংকর স্রোত আর মৃত্যুফাঁদ হয়ে ওঠা নীল বালুচর, সব পেরিয়েই যেন বঙ্গোপসাগরকে নিজের অনুশীলনের মাঠে রূপান্তরিত করেছেন কিশোরী ফাতেমা। যে সমুদ্র একসময় ছিল তার লড়াইয়ের জায়গা, সেই সমুদ্রের ঢেউ জয় করেই এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। আগামী সেপ্টেম্বরে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য ২০তম এশিয়ান গেমসের সার্ফিং ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে অংশ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী।

এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার প্রস্তুতিতে এখন প্রতিদিন কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে কঠোর অনুশীলন করছে ফাতেমা। একই আসরে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার সহ-সার্ফার মো. মান্নানও। কোচ সার্ফার রাশেদ আলমের তত্ত্বাবধানে দুজনেরই লক্ষ্য এবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদেরকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত করা। তবে ফাতেমার এই জায়গায় পৌঁছানোর গল্পটা কেবল সার্ফিংয়ের নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্যতা, পারিবারিক সংকট আর সামাজিক বাধা পেরিয়ে উঠে দাঁড়ানোর গল্প।
মহেশখালীতে ফাতেমাদের মূল বাড়ি হলেও জীবিকার তাগিদে একসময় পরিবার নিয়ে চলে আসেন কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায়। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ফাতেমা ছোট বেলায় তার বাবাকে হারায়। এরপর থেকেই সন্তানদের নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে সংসারের হাল ধরেন তার মা।
অভাবের সেই সংসারে ফাতেমার খেলাধুলায় সময় দেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম জোগাড় করাও ছিল বেশ কঠিন। তার ওপর সমাজের নানা কটুকথা ও নিরুৎসাহও ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু মায়ের উৎসাহে সমুদ্রের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার অন্যরকম সখ্যতা। ধীরে ধীরে ঢেউয়ের ভয়কে জয় করে সার্ফিং-ই হয়ে ওঠে তার স্বপ্ন।
সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে পাশে দাঁড়ান তার কোচ রাশেদ আলম। বাংলাদেশ সার্ফার গার্লস অ্যান্ড বয়েজ ক্লাবের অধীনে প্রশিক্ষণের সময় ফাতেমার আগ্রহ ও সম্ভাবনা দেখে তাকে নিয়মিত অনুশীলনে যুক্ত রাখেন তিনি। অর্থের সংকটে যখন খেলা চালিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ফাতেমার প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের পেছনে সহায়তা করেন কোচ। পাশাপাশি পড়াশোনার চাপও সামলাতে হয়েছে তাকে। আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় বসবে ফাতেমা। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রতিদিনের এ কঠোর প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে।
পরিশ্রমের অবশ্য ফলও এসেছে একের পর এক। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হবার রেকর্ডও গড়েন ফাতেমা। কক্সবাজারের ঢেউয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেওয়ার পর এবার তার চোখ আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি, তাই অন্য যেকোনো প্রতিযোগিতার চেয়ে আলাদা বলে মনে করছেন তিনি। সমুদ্রের স্রোত, ঢেউয়ের গতি ও ভারসাম্য এসবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে প্রতিদিন কঠোর অনুশীলন করছে সে। লক্ষ্য একটাই, দেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসে নেমে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করা।
ফাতেমার এই যাত্রায় সমুদ্র যেমন প্রতিপক্ষ, তেমনি তার সবচেয়ে বড় শিক্ষকও। বছরের পর বছর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই সে শিখেছে কীভাবে ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় অথবা কিভাবে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। একসময় যে মেয়েটির পরিবারের কাছে নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, আজ সেই মেয়েটিই বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে নামার অপেক্ষায়।
কক্সবাজারের সৈকত থেকে জাপানের এশিয়ান গেমস, এই পথটুকু ফাতেমার জন্যে মোটেও সহজ ছিল না। দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক বাধা কোনোটিই থামাতে পারেনি তাকে। এখন তার সামনে শুধু একটি লক্ষ্য, বঙ্গোপসাগরের ঢেউ পেরিয়ে এশিয়ান গেমসের মঞ্চে বাংলাদেশের নাম উঁচু করা এবং দেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে ইতিহাস লেখা।
ডিজে




