পবিত্র মাহে রমজানের আগমনী সওগাত নিয়ে বিশ্ব মুসলিমের জীবনে হাজির হয়েছে বরকতময় শাবান মাস। রমজানের প্রস্তুতির তাগিদ, শবে বরাতের মাহাত্ম্য এবং ইবাদতের বাড়তি সুযোগ নিয়ে হিজরি চান্দ্রবর্ষের অষ্টম মাস শাবান মুসলমানদের সামনে খুলে দেয় আত্মশুদ্ধির পথ। ইতিহাস, ফজিলত ও আমলের দিক থেকে এই মাসের গুরুত্ব আলাদা।
শাবান মাস ইসলামের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় বহন করে। হিজরতের দেড় বছর পর এই মাসেই পূর্বতন কিবলা ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে মক্কা শরিফের মসজিদুল হারাম তথা খানায়ে কাবাকে কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ফলে শাবান মাস একদিকে মুসলিম স্বাতন্ত্র ও ঐক্যের প্রতীক, অন্যদিকে কাবাকেন্দ্রিক মুসলিম জাতীয়তা ও ভ্রাতৃত্ববোধের স্মারক।
নবী করিম (সা.) শাবান মাসের ফজিলত প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবানকে রমজানের প্রস্তুতির সোপান হিসেবে গ্রহণ করতেন এবং এই মাসে বিশেষভাবে দোয়া ও ইবাদতে মনোযোগী হতেন। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ মাস রোজা রাখেননি, তবে শাবান মাসে তিনি সবচেয়ে বেশি নফল রোজা পালন করতেন। অন্য হাদিসেও এসেছে, শাবান ছাড়া অন্য কোনো মাসে তিনি এত অধিক হারে নফল রোজা আদায় করতেন না।
আরবি ভাষায় এ মাসের নাম ‘আশশাবানুল মুআজজম’, অর্থ মহান শাবান। মাহে রমজানের মর্যাদা রক্ষা ও হক আদায়ের অনুশীলনের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন। হজরত আনাস (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রমজানের পর কোন মাসের রোজা উত্তম। তিনি বলেন, রমজানের সম্মান প্রদর্শনের জন্য শাবানের রোজা উত্তম। হজরত আয়েশা (রা.) থেকেও বর্ণিত, শাবান ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় মাসগুলোর একটি এবং নফল রোজার মধ্য দিয়েই তিনি রমজানের প্রস্তুতি নিতেন।
নবীজির (সা.) দোয়া ও আমলের ধারা
রজব ও শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত এই দোয়া পড়তেন— ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজব ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগ না রমাদান।’ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। যেন রমজান পেয়ে মানুষ অধিক হারে রোজা, তারাবি, লাইলাতুল কদরের ইবাদত ও ইতিকাফের মাধ্যমে ফজিলত অর্জন করতে পারে। রজবের চাঁদ ওঠা থেকে রমজানের চাঁদ দেখা পর্যন্ত এই দোয়া পাঠ করা সুন্নত বা মুস্তাহাব হিসেবে বর্ণিত।
শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত নফল রোজা রাখতেন, বিশেষ করে সোম ও বৃহস্পতিবার। চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ আইয়ামে বিজের রোজাও তিনি গুরুত্ব দিতেন। রোজার পাশাপাশি নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশ্ত, আওয়াবিন, তাহিয়াতুল মসজিদসহ অন্যান্য নফল ইবাদতের দিকেও তিনি মনোযোগী ছিলেন।
হজরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন তিনি শাবানে বেশি রোজা রাখেন। উত্তরে নবী করিম (সা.) বলেন, রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এ মাস অনেকেই অবহেলা করে। অথচ এই মাসেই মানুষের আমল আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হয়। তাই তিনি চান তাঁর আমলনামা রোজা অবস্থায় আল্লাহর কাছে উঠুক।
শবে বরাতের তাৎপর্য
হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আল্লাহতায়ালা মধ্য শাবানের রজনীতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন, তবে তারা ছাড়া যারা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে এবং অন্যের ক্ষতি করার মানসিকতা পোষণ করে।
শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত ১৫ তারিখের রাতকে শবে বরাত বলা হয়। ‘শব’ মানে রাত, ‘বারাআত’ মানে মুক্তি। এই রাতে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং আগামী এক বছরের জন্য হায়াত, মউত ও রিজিকের বন্দোবস্ত নির্ধারিত হয় বলে বর্ণনা রয়েছে। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ১৫ শাবানের রাত এলে তা ইবাদতে কাটাতে এবং পরদিন রোজা রাখতে।
ভারসাম্যপূর্ণ আমলের শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে ভারসাম্যপূর্ণ নেক আমলের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল তা-ই যা নিয়মিত করা হয়। তিনি প্রায় গোটা শাবানে নফল রোজা পালন করতেন এবং অন্যদেরও উৎসাহ দিতেন। বর্ণনায় এসেছে, রজব মাসে তিনি প্রায় ১০টি এবং শাবান মাসে প্রায় ২০টি নফল রোজা রাখতেন, আর রমজানে ফরজ রোজা পালন করতেন।
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও প্রসিদ্ধ ইমামরা শাবান মাস এলেই বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করতেন। কোরআন নাজিলের মাস রমজানের বরকত পাওয়ার আশায় এই মাসে তিলাওয়াত ও ইসতেগফারে তারা মনোযোগী হতেন। সুরা আল-মুজজাম্মিলের ২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যা অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে উত্তম ও মহত্তর পুরস্কার হিসেবে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
রমজানের প্রস্তুতির মাস
শাবান মূলত মাহে রমজানের প্রস্তুতির মাস। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মাসে বেশি নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত ও নামাজ আদায়ের মাধ্যমে রমজানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন। তাঁর দোয়ার মধ্য দিয়েই শাবানের মর্যাদা স্পষ্ট হয়— হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
নফল রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, জিকির, তাসবিহ, দোয়া ও দান-সদকার মাধ্যমে এই মাসকে অর্থবহ করে তোলার তাগিদ দিয়েছেন নবী করিম (সা.)। উদ্দেশ্য একটাই— আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে সমাগত রমজানকে সুন্দর, ফলপ্রসূ ও ইবাদতে পরিপূর্ণ করা।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট




