ভেটেরিনারিতে ১০ জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলে উপাচার্য হওয়া লুৎফুরের বিরুদ্ধে ‘অভিযোগের পাহাড়’

তড়িঘড়িতে ৪০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে 'অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি’

থামছেই না চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম আর স্বজনপ্রীতি। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির নেপথ্যে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য—এমন অভিযোগ উঠেছে। একাধিক অভিযোগের আঙুল উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমানের দিকেই।

অভিযোগ উঠেছে, এই ভিসি নিজেই মাত্র ৩২ নম্বর পেয়েছিলেন এনাটমিতে। তাকে পাশ করাতে ৮ নম্বর গ্রেস দিয়েই এনাটমিতে উত্তীর্ণ করা হয়। অথচ গ্রেস দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান সিভাসুতেই এনাটমি বিভাগের অধ্যাপকের দায়িত্ব থেকে একলাফে ভিসি পদে ঠাঁই করে নেন বিএনপিপন্থী পরিচয়ে।

তবে এসব অভিযোগের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য চ্যালেঞ্জ করে বলেন, এসব অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে শিক্ষকতাই করব না।

তথ্যসূত্র বলছে, উপাচার্য নিজেকে বিএনপিপন্থী দাবি করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, তিনি আওয়ামী ঘরানার এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এছাড়া জামায়াতের সঙ্গেও তার ভালো বোঝাপড়া রয়েছে বলে দাবি বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। এছাড়া চট্টগ্রামের জামায়াতের এক নেতার সুপারিশে তিনি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যসূত্র বলছে, কোনো এক অদৃশ্য কারণে ১০ জনের বেশি জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান। জ্যেষ্ঠতা, একাডেমিক অবস্থান, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকেও তিনি অনেক শিক্ষকের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন বলে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক। গুঞ্জন রয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।

অনুসন্ধান বলছে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেন তিনি। এই ৪০ জনের মধ্যে তার নিকটআত্মীয় নিজ জেলা ময়মনসিংহের এলাকার লোকজনকেও ‘অনিয়ম’ ও ‘স্বজনপ্রীতি’ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে কম্পিউটার টাইপিস্ট মোহাম্মদ এমদাদুল হক উপাচার্যের নিকটাত্মীয় বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

তথ্যসূত্র বলছে, এই নিয়োগে ভিসির একাধিক আত্মীয়স্বজনও রয়েছেন। তবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই ধাপে ধাপে এসব নিয়োগ কার্যকর হয়েছে বলে জানান উপাচার্য।

এ বিষয়ে জানতে কম্পিউটার অপারেটর এমদাদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এসব ভুয়া কথা। তার শত্রুরা এসব কথা ছড়াচ্ছেন। তার সঙ্গে উপাচার্য স্যারের ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই।

তথ্যসূত্র বলছে, নতুন প্রতিষ্ঠিত বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদে অধ্যাপক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের উপাচার্য ড. লুৎফুল আহসান।

২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর সেলুলার অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজির জন্য অধ্যাপক পদে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম জিপিএ ৩ দশমিক ৭৫ এবং মলিকুলার বায়োলজি বিষয়ে পিএইচডি থাকার শর্ত উল্লেখ ছিল। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্ত মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খান উল্লিখিত ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ না করলেও তাকে অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একটি পদের বিপরীতে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খানের নামে ইন্টারভিউ কার্ড ইস্যু করা হয়। অথচ তিনি স্নাতক পর্যায়ে ২০০২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৩ দশমিক ৫০ পেয়েছেন, যা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ন্যূনতম জিপিএ ৩ দশমিক ৭৫-এর চেয়ে কম। ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ না করা সত্ত্বেও, তৎকালীন উপাচার্য ড. লুৎফুল আহসান নিজ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ঘনিষ্ঠ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তাকে নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যসূত্র বলছে, এসব অনিয়মের তথ্য বর্তমান উপাচার্যের কাছে থাকলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি বলেও অভিযোগ ওঠে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগটি এমন সময়ে দেওয়া হয়, যখন সবাই নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করেন তিনি। একরকম তাড়াহুড়ো করেই তিনি এটি করেছেন। সেখানে তিনি তার নিকটাত্মীয়দের চাকরি দিয়েছেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি নিজ ক্ষমতাবলে এসব করছেন। এসব বিষয়ে তিনি আমাদের সঙ্গেও কোনো আলোচনা করেননি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। কেউ সুবিধা ভোগের জন্য আমার নাম ব্যবহার করলে সেটা আমার দায়ভার নয়। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি এসব অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পক্ষ আমাকে সরাতে চাচ্ছে। আমাকে সরিয়ে তারা ভিসি হতে চায়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একমাত্র বিএনপিপন্থী ভিসি। গত ১৭ বছর আমিও অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ছাত্রলীগের আমলে যারা শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছিল তাদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

ksrm