ভুল খাবারে শিশুদের শরীরে কমছে রক্ত, চট্টগ্রামে দুই বছরে রোগী আড়াই গুণ

আয়রনের ঘাটতিতে বাড়ছে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতায় আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা ৬৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে, অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। সরকারি হাসপাতাল ও শিশু বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে আসা অসংখ্য শিশুর সিবিসি বা কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট পরীক্ষায়ও ধরা পড়ছে উদ্বেগজনক হারে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি। চিকিৎসকদের ভাষ্য, অনেক শিশু এমন অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছায়, যখন তাদের শরীরে ইতোমধ্যেই মারাত্মক অ্যানিমিয়া তৈরি হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি, ভুল খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত দুধনির্ভরতা ও কৃমির সংক্রমণ শিশুদের এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সিবিসি পরীক্ষায় মিলছে উদ্বেগজনক চিত্র

চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের সিবিসি পরীক্ষায় নিয়মিতই হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা ধরা পড়ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, শরীরে আয়রনের মজুদ কমে গেলে শিশুরা দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, ক্ষুধামন্দা এবং বিকাশজনিত নানা সমস্যায় ভুগতে শুরু করে।

চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বাসনা মহুরী বলেন, আগের তুলনায় এখন শিশুদের মধ্যে আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতার রোগী অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। বাড়ন্ত বয়সে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের অভাব, অতিরিক্ত দুধ খাওয়ানো এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার না পাওয়াই এর প্রধান কারণ।

তিনি বলেন, অপুষ্টি, খাওয়াদাওয়া নিয়ে অভিভাবকদের ভুল ধারণা, শিশুর খাবারে আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও কপারজাতীয় খনিজের ঘাটতি, এমনকি থাইরয়েড হরমোনের অভাবও রক্তস্বল্পতার কারণ হতে পারে। অনেক অভিভাবক এক বছরের বেশি বয়সী শিশুকেও দিনে তিন থেকে চারবার বা তার বেশি শুধু দুধ খাওয়ান। অথচ মাছ, ভাত বা তরকারির মতো খাবার দেন না। দুধে রক্ত তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান খুব কম থাকায় এসব শিশু সহজেই রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হয়।

ভুল খাদ্যাভ্যাসেই বড় ঝুঁকি

চিকিৎসকদের মতে, এক বছর বয়সের পরও শুধু দুধনির্ভর খাদ্যাভ্যাস শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে তারা মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শাকসবজি কিংবা ভাত-তরকারির মতো আয়রনসমৃদ্ধ খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছয় মাস বয়সের পর শুধু বুকের দুধ শিশুর প্রয়োজনীয় আয়রনের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাই এ সময় থেকেই আয়রনসমৃদ্ধ সম্পূরক খাবার শুরু করা প্রয়োজন।

যেসব শিশু বেশি ঝুঁকিতে

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়া (প্রিম্যাচিউর), কম ওজন নিয়ে জন্মানো, যমজ নবজাতক এবং যেসব শিশুর মায়েরা গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাননি, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দীর্ঘদিন ডায়রিয়া বা কৃমির সংক্রমণে ভোগা শিশু, এক বছরের আগেই গরু বা ছাগলের দুধ পান করা শিশু এবং ছয় মাসের পরও সম্পূরক খাবার না পাওয়া শিশুরাও আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, এসব শিশুর শরীরে জন্মের সময় থেকেই আয়রনের মজুদ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে জীবনের প্রথম কয়েক মাসেই তাদের আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ সময় পর্যাপ্ত আয়রন না পেলে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয় এবং আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা তৈরি হতে পারে।

শুধু আয়রনের অভাব নয়, থাকতে পারে গুরুতর রোগও

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেন, সব ধরনের অ্যানিমিয়া আয়রনের অভাবে হয় না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, কৃমির সংক্রমণ, থ্যালাসেমিয়া, ব্লাড ক্যানসার, হিমোফিলিয়া, ম্যালেরিয়া কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, খালি পায়ে চলাফেরার কারণে হুক কৃমির সংক্রমণ হলে দীর্ঘদিন ধরে রক্তক্ষরণের মাধ্যমে অ্যানিমিয়া তৈরি হতে পারে। একইভাবে গোলকৃমি, দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রের সংক্রমণ এবং পুষ্টিহীনতাও রক্তস্বল্পতার বড় কারণ।

যে লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়

ডা. বাসনা মুহুরী বলেন, শরীরে আয়রনের ঘাটতি শুরুতে অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা বাড়লে অতিরিক্ত ক্লান্তি, অবসাদ, ক্ষুধামন্দা, অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে থাকা, ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দ্রুত হৃদস্পন্দন, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া, জিহ্বায় ঘা এবং নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঘাটতির প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। এতে তাদের মনোযোগ কমে যায়, শেখার সক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই এসব লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

দুই বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ

শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়রন শুধু রক্ত তৈরির উপাদান নয়, এটি মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং শারীরিক বৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছরে মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে। এই সময়ে আয়রনের ঘাটতি হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যেতে পারে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিনই আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতায় আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিতে আসে। গুরুতর অবস্থায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের শিশু বিভাগের দুই ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতায় ৬৩ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ জনে। ২০২৫ সালে চিকিৎসা নিয়েছে ১৬৫ জন। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এ রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৯২ শতাংশ বেড়েছে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ছয় মাস বয়সের পর থেকেই শিশুকে আয়রনসমৃদ্ধ সম্পূরক খাবার দিতে হবে। নিয়মিত মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, লাল চাল ও সবুজ শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। আয়রন শোষণ বাড়াতে কমলা, পেয়ারা ও টমেটোর মতো ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ ফল খাওয়ানো উচিত। দুই বছর বয়সের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ দিতে হবে। শিশু ফ্যাকাশে দেখালে বা দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে দ্রুত সিবিসি পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মাহমুদা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, শিশুর বয়স ছয় মাস হওয়ার পর বুকের দুধের পাশাপাশি সুষম সম্পূরক খাবার দিতে হয়। দুই বছর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এক বছর বয়সের আগে গরুর দুধ খাওয়ানো উচিত নয়। একই সঙ্গে বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত ইনফ্যান্ট ফর্মুলা ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, বয়সভেদে উপযুক্ত ফর্মুলা মিল্কে শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে। অভিভাবকেরা সঠিক ফর্মুলা নির্বাচন বা খাওয়ানোর নিয়ম না জানলে অপুষ্টি বা ভুল খাদ্যাভ্যাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালের অসুস্থ শিশুর সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা (আইএমসিআই) কর্নারে নার্স ও স্বাস্থ্যসহকারীরা শিশুদের পুষ্টি বিষয়ে অভিভাবকদের পরামর্শ দেন। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালেও আইএমসিআই কর্নার রয়েছে। সেখানে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের নিবন্ধনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। বিশেষ করে এআরআই, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, কানপাকা ও জ্বরের মতো রোগের ক্ষেত্রে এ কর্নারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সিপি

ksrm