মাত্র আড়াই বছরে কাগজে-কলমে ‘রপ্তানি’ দেখিয়ে চীন থেকে সম্পূর্ণ তৈরি টাইলস আমদানি, আর সেই আড়ালে ৩৮ কোটি ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা শুল্ক ফাঁকি। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের চর রমজান এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ-তাইওয়ান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ঘিরে এমন অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ধীরাজ চন্দ্র বর্মন। তিনি বাদী হয়ে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা নম্বর ০২ হিসেবে এজাহার দায়ের করেন।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-তাইওয়ান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লি. ২০১৩ সালে শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বন্ড সুবিধার আওতায় নিবন্ধিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল বা আনফিনিসড টাইলস আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করার পর তা রপ্তানি করার কথা ছিল। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, তারা কাঁচামালের পরিবর্তে সম্পূর্ণ তৈরি টাইলস বা ফিনিসড টাইলস আমদানি করে।
২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬২টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ২২ হাজার ৯৪৩ মেট্রিক টন সম্পূর্ণ তৈরি টাইলস আমদানি করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের নমুনা পরীক্ষায় বুয়েটের গ্লাস এন্ড সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নিশ্চিত করে, আমদানিকৃত পণ্যগুলো তৈরি টাইলস, যা বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানির অনুমতি নেই।
আমদানির বিপরীতে ৮০টি বিল অব এক্সপোর্টের মাধ্যমে রপ্তানির তথ্য দেখানো হলেও তদন্তে জালিয়াতির অভিযোগ উঠে আসে। ব্যাংকে জমা দেওয়া বিল অব লেডিং যাচাই করে গোল্ডেন কন্টেইনার ও ইনকন্ট্রেড লিমিটেড নামে দুটি অফ ডক কোম্পানি জানায়, তাদের মাধ্যমে কোনো রপ্তানি হয়নি। একইভাবে শিপিং এজেন্ট ওয়ান কার্গো লিমিটেড ও জেডএন্ডজেড এক্সপ্রেস সার্ভিস জানায়, সংশ্লিষ্ট বিল অব লেডিংগুলো জাল এবং সেগুলো তাদের ইস্যুকৃত নয়।
রপ্তানি চালান পরীক্ষণের দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা দিলীপ চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে বলেন, তারা কোনো চালান পরীক্ষা করেননি এবং চালানে থাকা তাদের স্বাক্ষর জাল।
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমদানিকৃত টাইলস স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়েছে এবং মজুদ হিসাবেও কারচুপি হয়েছে।
মামলায় গুলশান, বনানী ও উত্তরা এলাকার বাসিন্দা শিল্পগ্রুপের শীর্ষ নির্বাহী এবং মীরসরাই ও ফটিকছড়ির দুটি সিএন্ডএফ এজেন্টকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হাসান শরিফ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জিয়া উদ্দিন, পরিচালক খাজা শাহাদতউল্লাহ, মো. জিয়াউর রহমান, আদিল রিজওয়ান, মো. খায়রুজ্জামান, মো. শহিদুল হক ও হাসান শাহীন। সিএন্ডএফ এজেন্ট ট্রিপল এন্টারপ্রাইজের মালিক দীপান্বিতা বড়ুয়া ও সুরীত বড়ুয়াকেও আসামি করা হয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ভুয়া রপ্তানি কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংকে জমা দেন এবং চীন থেকে টাইলস আমদানি করে ৩৮ কোটি ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা শুল্ক ফাঁকি দেন। এতে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেজে/সিপি




