ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতি, প্রতারণা ও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ ওরফে এস আলমসহ ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি।
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্পোরেট শাখার ফার্স্ট এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসীন আলী দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগপত্রটি জমা দেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে দুদকে দেওয়া অভিযোগপত্রে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নাম লেখা হয়েছে ‘মো. শাহবুদ্দিন’। একই সঙ্গে সেখানে তাঁর ‘রাষ্ট্রপতি’ পরিচয় উল্লেখ না করে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
ঋণ জালিয়াতির কেন্দ্রবিন্দুতে ‘সুপ্রভ কম্পোজিট’
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী, কথিত এই ঋণ জালিয়াতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি মূলত একটি রুগ্ণ ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। এর প্রাথমিক বিনিয়োগ সীমা ছিল মাত্র ১০০ কোটি টাকা।
তবে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক প্রভাব ও সরাসরি সহায়তায় যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ করেছে ইসলামী ব্যাংক। প্রথমে ঋণের সীমা ২০০ কোটি টাকা এবং পরে অবৈধভাবে তা ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ে ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে ২০১৭ সালের ২০ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাহী বোর্ডের সভায় এসব ঋণ অনুমোদন করা হয়।
ঋণ পরিশোধের জন্য ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় তাগাদাপত্র ও চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও ঋণগ্রহীতারা কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের তালিকায় এস আলমসহ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা
ইসলামী ব্যাংকের করা অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস ওরফে আলহাজ্ব মো. ইউনুস বাদলের।
এ ছাড়া অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এ বি এম শামসুল হাসান, সালেহা শাহিন ও উম্মে সালমা শারমিন।
উল্লেখযোগ্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ ওরফে এস আলম। অভিযোগে তাঁকে ঋণের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তালিকায় আরও রয়েছেন গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামিলা আক্তার সীমা, এলিট সকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কবির হোসাইন, সরকার ফারজানা ইসলাম, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধি মেজর জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন, এক্সেল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডের সদস্য প্রতিনিধি ও ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য প্রফেসর ডা. মো. সিরাজুল করিম, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য প্রফেসর মো. নজমুল হাসান, প্রফেসর মো. কামাল উদ্দিন, এবিসি ভেনচার্স লিমিটেডের সদস্য ও প্রতিনিধি এবং ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য মো. জয়নাল আবেদীন, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক সৈয়দ আবু আসাদ, প্রফেসর ড. কাজী শাইদুল আলম, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক মো. সোলাইমান, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আবদুল হামিদ মিয়া, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মওলা এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইনভেস্টমেন্ট কমিটির কনভেনর মোহাম্মদ কায়সার আলী।
অভিযোগে আরও রয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, ড. তানভীর আহমেদ, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক প্রফেসর ড. মো. সালেহ জহুর, সাবেক পরিচালক মো. কামরুল হোসেন, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক প্রফেসর ড. মো. ফয়সাল আলম, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহবুদ্দিন, সাবেক চেয়ারম্যান মো. আহসানউল আলম, পরিচালক প্রফেসর (ডা.) কাজী শহীদুল আলম, সাবেক পরিচালক খোরশেদুল আলম, মো. নাসির উদ্দিন, সাবেক ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তাহের আহমেদ চৌধুরী, এফসিএস ও সাবেক ডিএমডি জিইউ এম হাবিব উল্লাহ, সাবেক ডিএমডি মোহাম্মদ সাব্বির, সাবেক ডিএমডি মিফতা উদ্দিন, সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.এফ.এম. কামাল উদ্দিন এবং সাবেক ডিএমডি কাজী মো. রেজাউল করিম।
অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭(এ), ৩৪ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(১)(২) ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
‘আদালতের নির্দেশনায় তথ্য দুদকে জমা’
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্পোরেট শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী বলেন, ‘এস আলমের ঋণ অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যাংকের একাধিক মামলা রয়েছে। আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে একটি মামলার তথ্য সরবরাহের অংশ হিসেবে আমরা দুদকে এই ঋণ অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য জমা দিয়েছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন কোনো অভিযোগ এখনো হাতে পাইনি। বর্তমানে আমাদের কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। কমিশন পুনর্গঠিত হওয়ার পর এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।’
সিপি




