ভাষণে আওয়ামী লীগবিরোধী হুঙ্কার, টেবিলে নেতার ছবিযুক্ত ‘অনুদান’
চট্টগ্রামে এনসিপির ইফতার ঘিরে নানা অভিযোগ
মঞ্চে ছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একসঙ্গে না থাকার কড়া ঘোষণা, আর ঠিক সেই আসরের টেবিলে টেবিলে সাজানো ছিল এক আওয়ামী লীগ নেতার ছবিযুক্ত পানির বোতল। সোমবার (২ মার্চ) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশে দ্য কিং অব চিটাগাং কনভেনশন সেন্টারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিভাগীয় সাংগঠনিক ইফতার মাহফিলে এমন বৈপরীত্যের দৃশ্য সামনে আসে। বক্তব্যে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি, আর একই অনুষ্ঠানে সেই আওয়ামী লীগ নেতা অনুদান গ্রহণ। সব মিলিয়ে নতুন দল এনসিপির ইফতার আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। এছাড়া গণহারে মোবাইল চুরি ও নিম্নমানের ইফতার সরবরাহের অভিযোগেও আলোচনায় এসেছে অনুষ্ঠানটি।

বক্তব্যে কড়া অবস্থান, টেবিলে আওয়ামী লীগ নেতার বোতল
অনুষ্ঠানে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, চট্টগ্রামে ফ্যাসিস্টদের আস্ফালন এখনও কমেনি। এনসিপি ও পতিত আওয়ামী লীগ একসঙ্গে থাকতে পারে না। যে জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম শুরু হবে, সেখানে হয় আওয়ামী লীগ থাকবে, নয়তো এনসিপি থাকবে। তিনি বলেন, এনসিপির ১০ জন নেতাকর্মী থাকলেও সেই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের কোনো কার্যক্রম বা নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট সংগঠনের কোনো অফিস যেন সুযোগ না পায়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেতাকর্মীদের।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাঝখানে বিএনপিতে যাওয়া এক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সিটি মেয়র মনজুর আলমের ছবিযুক্ত পানির বোতল সরবরাহ করা হয় একই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকে অনেক নেতাকর্মী এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এ নিয়ে নেতাদের প্রশ্ন করেন। ওই ইফতার মাহফিলের নামে আওয়ামী লীগ নেতা মনজুর আলমসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অনুদান নেওয়া হয়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ তোলেন। এর মধ্যেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, মনজুর আলম এনসিপিতে যোগ দিয়ে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এনসিপি নেতারা কোনো মন্তব্য করেননি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য জহিরুল ইসলাম।

মনজুর আলমের দলবদলের রাজনীতি
মনজুর আলম দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। উত্তর কাট্টলী থেকে তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালে পরাজয়ের পর আবার আওয়ামী লীগে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।

গত বছরের ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের উত্তর কাট্টলী এলাকায় সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা ‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ গুঁড়িয়ে দেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪০ একর খাসজমির ওপর নির্মিত ওই স্থাপনার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩২০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। সেখানে কাভার্ডভ্যান ইয়ার্ড, স্কেভেটর ইয়ার্ড ও চীনা কোম্পানিকে ভাড়া দেওয়া স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল।
২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর উত্তর কাট্টলীতে শেখ রাসেলের জন্মদিনে স্টেডিয়ামটির যাত্রা শুরু হয়। মনজুর আলমের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হোসনে আরা মনজুর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অর্থায়নে নির্মিত স্টেডিয়ামটির উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। ওই অনুষ্ঠানে মনজুর আলম বলেন, ‘আমি এবং আমার পরিবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একটি পরিবার। জাতির জনক, বঙ্গমাতা ও শেখ রাসেলের আত্মার মাগফিরাতের জন্য আমাদের নানা কর্মসূচি থাকে। আমরা চাই শেখ রাসেল বেঁচে থাকুক তরুণ প্রজন্মের মাঝে। এজন্য এই স্টেডিয়ামের নাম দিয়েছি শেখ রাসেলের নামে।’
২০২৩ সালের ১৭ মার্চ কাট্টলী রাসমণি ঘাটের শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১০৩ ফুট দৈর্ঘ্যের কেক কেটে আলোচনায় আসেন মনজুর আলম।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আবার বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে সক্রিয় হন। সর্বশেষ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপি এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পাওয়ায় নগরের সাতটি মসজিদে দোয়া মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত, সাতটি মন্দিরে, গির্জায় এবং মাদার তেরেসার জাতীয় চিকিৎসালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করেন মনজুর আলম। এ সময় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের হাত শক্তিশালী করার জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
এক আসরে একাধিক অভিযোগ
সোমবারের ইফতার মাহফিলে চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদারের আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকা থেকে নেতৃত্ব দিলেই হবে না, দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম থেকেই কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইফতার মাহফিলের ব্যয় মেটাতে এনসিপির স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পরে এনসিপির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের ঘটনায় একাধিক মামলাও হয়েছে।
এদিকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত এনসিপি কর্মী ও সাংবাদিকরা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে বড় অংকের চাঁদা নেওয়া হলেও ইফতারে নিম্নমানের সামগ্রী পরিবেশন করা হয়। কলা, বরইসহ কিছু খাবার পচা ছিল বলে অভিযোগ তোলেন অনেকে। এ কারণে অনেকে ইফতারই করতে পারেননি, কেউ কেউ ইফতার না করেই অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে যান।
এদিকে একই অনুষ্ঠানে গণহারে মোবাইল ও মানিব্যাগ চুরির ঘটনাও ঘটে। উপস্থিত এক নেতা জানান, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্যের সময়ই এক এনসিপি কর্মীর মোবাইল চুরি হয়। এ নিয়ে হইচই শুরু হওয়ার পর আরও অনেকেরই মোবাইল চুরি যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এ নিয়ে ভেতরে ও বাইরে হট্টগোল হয় এবং চোর সন্দেহে এক তরুণকে মারধরের ঘটনাও ঘটে।
সিপি




