ভারতে করোনার কবলে বাংলাদেশি রোগীর মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসার গল্প

0

ভারতের চেন্নাইয়ে মূল অ্যাপোলো হাসপাতালের সাথে লাগোয়া আমাদের লজ— ওয়ালেস গার্ডেনে। পরিপাটি একটি কক্ষ। কক্ষের মধ্যেই আলাদা টয়লেট ও কিচেন। এসি, ফ্রিজ, টিভি, ফ্যান, সুপেয় জল, খাট— সবকিছুই ঝকঝকে, পরিচ্ছন্ন ও গোছানো।

সবচেয়ে বড় কথা পরিবেশটা সত্যিই চমৎকার। পাখির কলকাকলীতে মুখর আশপাশ। কোকিলের কুহূতানে নিমেষেই মন ভালো হয়ে যায়। জানালার পর্দাটা একটু সরালেই বিস্তীর্ণ আকাশ আর সবুজে ছাওয়া চারদিক। প্রকৃতির অপরূপ মমতায় গড়া জায়গাটি। আমাদের গ্রামের বাড়ির মিল খুঁজে পাই।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার প্রায় ১৩ দিন পর ফিরলাম বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে সদ্য প্রিয় হয়ে ওঠা লজটিতে।

অ্যাপোলো হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. জগদীশ সিটি স্ক্যান করানোর পরদিন রিপোর্ট দেখে যখন বললেন, ‘তুমি কোভিড আক্রান্ত। এখানে এবং আশপাশে কোথাও কোনো সিট খালি নেই। দ্রুত অন্য কোথাও ভর্তি হও। নিদেনপক্ষে সরকারি হাসপাতালে। খুবই জরুরি।’

ভারতে করোনার কবলে বাংলাদেশি রোগীর মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসার গল্প 1

এ কথা শুনে আকাশ ভেঙে পড়েছিলো মাথায়। বিকেল থেকে সারা শহর তন্ন তন্ন করে সেই রাতে কোথাও ভর্তি হতে পারলাম না। নির্ঘুম রাত কাটলো দুজনেরই। আমার কষ্টে সহধর্মিণী তাহা নীল হয়ে যাচ্ছে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি ওকে বোঝাতে— ‘স্বাভাবিক আছি, চিন্তা করো না!’

প্রীতিভাজন জাবিন-রাজ্জাকদের দৌড়াদৌড়িতে শেষমেশ যে হাসপাতালের খবর পেলাম সেটি অনেকটা ব্যয়বহুল এবং আমাদের লজ থেকে খানিকটা দূরে। পরদিন সারাদিন সেই হাসপাতালে কিছুক্ষণ পর পর ফোনে যোগাযোগ চলতে থাকলো। শেষপর্যন্ত সিট পাওয়ার আশ্বাসের অপেক্ষায় না থেকে বিকেল তিনটায় সেই হাসপাতালে পৌঁছলাম।

সেখানে কোভিড রোগীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা। অজস্র অপেক্ষারত মানুষ। সবাই হয়তো রোগী না। আত্মীয়-স্বজনও কেউ-কেউ। আমরাও অন্য অনেকের মতো অস্থির অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এক সময় আশা ছেড়ে দিলাম। এক সময় তারাও সাফ জানিয়ে দিলো, আজ আর কোন সিট খালি নেই। দুঃখিত। বললো, তারা আশা করেছিলেন, কোনো কেবিন ফাঁকা হবে। কাল যেন একবার খবর নিই এবং সবসময় যোগাযোগে থাকি।

এর মধ্যে অমন অসুস্থতায়ও মনোবল শক্ত করে ভারতের মাননীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলাকে (বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার) আমার অবস্থা, অবস্থান এবং শারীরিক কন্ডিশন জানিয়ে এসএমএস করলাম। তিনি আমাকে অবাক করে তাৎক্ষণিক ফিরতি জবাবে লিখলেন, ‘ওখানেই একটু অপেক্ষা করো। ধৈর্য ধরো।’

অবশেষে চেন্নাইয়ের আমিনিজকরইয়ের নেলসন রোডে বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘এমজিএম হেলথকেয়ার’ কর্তৃপক্ষ আমাকে ভর্তি নেন রাত প্রায় ৮টায়। এর এক ঘন্টার মধ্যেই রাত ৯টা নাগাদ আমার চিকিৎসাও শুরু হয়ে গেল।

জানলাম, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতুলনীয় ভূমিকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার ভর্তি নিশ্চিত করেছে। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই পরমবন্ধু ভারতের মাননীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলাসহ অজানা-অচেনা সংশ্লিষ্ট সকল মহানুভবের প্রতি।

যা হোক, করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমার শারীরিক অবস্থা যেখানে পৌঁছেছিল, সেখান থেকে ফেরার সমস্ত আশা আমি একসময় ছেড়ে দিয়েছিলাম।

কোভিড, টাইফয়েড, গলায় ইনফেকশন, মুখের ভেতরে মাংস ঝরে পড়া, স্ট্রং ডায়রিয়া, সারা শরীরে ‎র‌্যাশ। কী হয়নি? ভাগ্যিস শ্বাসরুদ্ধকর শ্বাসকষ্ট ছিল না। ছিল না কাঁশিও। যদিও পরে কাঁশি যোগ হয়েছে। তবে খুব একটা কষ্ট ছিল না তাতে। দিনরাত স্যালাইন, প্লাজমা, ইনজেকশন, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বিরামহীন। এমনও হয়েছে, শরীরে আর কোথাও রক্ত নেওয়ার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। শরীরে এমন কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই যেখানে সূঁচের দগদগে চিহ্ন নেই। ১৩ দিনে ক্যানোলা পরিবর্তন করতে হয়েছে ৫ বার।

আমার তখন একটাই চিন্তা, আমার স্ত্রী তাহা আমার লাশটা শেষ ঠিকানায় পৌঁছাতে পারবে তো! নিদেনপক্ষে চট্টগ্রামে। যেখানে আমার শেষ ঘুম হবে। অপার শান্তি!

জানি, অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে। কোভিড রোগীদের লাশ নিয়ে কী অবস্থা হয়, তা তো চোখের সামনে দেখেছি প্রতিদিন। শেষপর্যন্ত সে কী করবে? কতটুকুই বা করতে পারবে? কেমন করে সইবে এ শোকব্যথা। কেমন করে ফিরবে ও এমন শূন্য হয়ে! ওর মতো এমন কোমল মনের মেয়েটি এ কয়দিনেই যেন অনেকটা শেষ। তাহা’র জলভরা চোখে দেখি পৃথিবীর চরম সর্বনাশা অমাবশ্যা।

আমি প্রতিদিনই নিস্তেজ হতে হতে, নিস্পৃহ নিস্তব্ধতা নেমে আসে পুরো শরীর-মন জুড়ে। কাউকেই বিস্তারিত বলি না।
এ যাত্রায় বোধ হয় আর রক্ষা হলো না আমার!

ওদিকে স্বয়ং আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করছে আমার স্বজনেরা। তাঁদের পৃথিবী নাড়িয়ে দেওয়া বিলাপ আর চোখের জলে আল্লাহ্র আরশ কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিন্তু কোনো ফয়সালা পাচ্ছে না! এ যেন কঠিন পরীক্ষা। দিনরাত মসজিদ-মাজার-মন্দির, রোজা, উপবাস, দান-সদকা সবাই সবকিছু করছে সাধ্যমতো। আমার নিত্য ভালো চাওয়া ভালো মানুষগুলো থেমে নেই কেউ। কত মানুষ আমার জন্য তাহাজ্জুদে চোখের পানি ফেলছে। প্রতিটা ওয়াক্তে দুহাত তুলে মোনাজাত করছে, কত দোয়া-দরুদ-নামাজ পড়ছে, রাত জেগে স্ব-স্ব সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে। আহা, এই ঋণ শোধ করার কোনো যোগ্যতাই নেই আমার।

স্রষ্টার সাথে আমার প্রাণপণ লড়াই। আমি তো জানি খোদা আমি কোন পাপ করিনি, অন্যায় করিনি, কারও খারাপ চাইনি কোনোদিন। সারাজীবন মানুষকে সাহস দিয়েছি, সুপরামর্শ দিয়েছি। গীবত থেকে দূরে থেকেছি, মানুষের জন্য প্রাণ উজাড় করে নিত্য করার-দেয়ার চেষ্টা করেছি। অভুক্তকে খাইয়েছি, নিরন্নের পাশে দাঁড়িয়েছি। প্রতিনিয়ত মানবিক হওয়ার চেষ্টা করছি। শুদ্ধতায় জীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করেছি।

মানলাম, আমার অসাবধানতায়-অজান্তে কেউ কষ্ট পেয়েছে। কিংবা কোন পাপও যদি এই নশ্বর জীবনে করেও থাকি সে তুমিই জানো মেহেরবান। আমার তো জানা নাই। আমার সকল অহংকার চূর্ণ করে, আমায় ক্ষমা করো হে প্রভু। শুধু এ যাত্রায় আমাকে বাঁচিয়ে দাও।

মহামহিম দয়ালু তিনি। আমাকে হয়তো ক্ষমাই করেছেন। নইলে অমন মৃত্যু গহ্বর থেকে ফিরলাম কিভাবে?

চেন্নাইয়ের ‘এমজিএম হেলথকেয়ার’ হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিনের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শিবরাজের কথা কোনোদিনও ভুলবো না— যার নেতৃত্বে বিশাল টিম কাজ করেছে আমার সুস্থতার জন্য। হাসপাতালটির প্রত্যেক চিকিৎসক, নার্স, ব্রাদার, আয়া-সুইপার, রক্ত সংগ্রহকারী, খাবার সরবরাহকারী সর্বোপরি প্রতিটি কর্মীর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ ১৩টি দিন তারা আমাকে হাতের তালুতে করে রেখেছেন— পরম যত্নে ও অশেষ ভরসা নিয়ে।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm