ভাগ্যবদলের তাঁত প্রকল্প এখন কেবল হতাশা
৬ বছরেরও বেশি অব্যবহৃত মেশিনে মরিচা
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর ইউনিয়ন খৈয়াছড়া চা বাগানসংলগ্ন বালিধন ত্রিপুরা পাড়ায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় স্থাপন করা হয়েছিল একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওই তাঁত ও কাপড় উৎপাদন প্রকল্প উদ্বোধনের পরই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা মেশিনগুলো এখন মরিচা ধরা লোহায় পরিণত হচ্ছে। পরিকল্পনাহীনতা, প্রশাসনিক দায়সারা মনোভাব ও জবাবদিহির অভাবে প্রকল্পটি এখন সরকারি অর্থ অপচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টিনশেডের একটি ঘরের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে ছয়টি তাঁত ও কাপড় তৈরির ভারী মেশিন। কোথাও জমেছে ধুলোর স্তর, কোথাও মরিচা। একটি মেশিনে এখনো আটকে আছে আধা-তৈরি কাপড়—যেন উদ্বোধনের দিনের অসমাপ্ত প্রদর্শনী সময়ের ভেতর থমকে আছে। চারপাশে নেই কোনো শ্রমিক, নেই উৎপাদনের কোনো চিহ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য, উদ্বোধনের দিন অল্প সময়ের জন্য মেশিন চালানো হলেও পরে আর কখনো তা চালু হয়নি।
হৃদয় ত্রিপুরাসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকল্প চালুর সময় তাদের কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও স্বাবলম্বী জীবনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কেউ কোনো প্রশিক্ষণ পাননি, গড়ে ওঠেনি কোনো ব্যবস্থাপনাও। ফলে শুরু হওয়ার আগেই প্রকল্পটির কার্যক্রম থেমে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ বরাদ্দ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। উদ্বোধন করেন তৎকালীন সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সায়েদুল আরেফিন।
বর্তমানে দিয়ারা অপারেশনের সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনরত মো. সায়েদুল আরেফিন বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। পরিচালনার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু করোনা মহামারি শুরু হওয়ায় কার্যক্রম আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। দীর্ঘ প্রায় দুই মাস চেষ্টা করেও প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক নাম, প্রকল্প প্রস্তাবনা, ব্যয় বিবরণী কিংবা কোন সরকারি দপ্তরের অধীনে এটি বাস্তবায়িত হয়েছিল—সেসব তথ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট নথি পাওয়া যায়নি। এমনকি বর্তমান উপজেলা প্রশাসনের কাছেও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দপ্তরের স্পষ্ট তথ্য নেই।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পের নথিপত্রই যদি প্রশাসনের কাছে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে এর জবাবদিহিতা কোথায়?
ভূজপুর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে ফুল কুমার ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তির তথ্য পাওয়া যায়। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়েছিল, কিন্তু পরে আর চালু হয়নি। যাদের কাজ করার কথা ছিল, তারা কোনো প্রশিক্ষণই পায়নি। শুরু থেকেই এটি ছিল পরিকল্পনাহীন উদ্যোগ।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি মূলত উদ্বোধনকেন্দ্রিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ ছিল। বাস্তবায়নের আগে চাহিদা যাচাই, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা বাজারসংযোগের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা ছিল না। ফলে যাদের উন্নয়নের কথা বলে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ কোনো সুফলই পাননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে শুধু ফিতা কাটা হয়েছে। তারপর আর কেউ ফিরে তাকায়নি। এখন লাখ লাখ টাকার মেশিন নষ্ট হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষার্থী হৃদয় ত্রিপুরা বলেন, ‘কারখানাটি উদ্বোধনের দিনই শুধু চালু করা হয়েছিল। পরদিন থেকেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন লাখ লাখ টাকার সরকারি মেশিনারিজ অচল পড়ে আছে। অথচ এই তাঁত শিল্পের মাধ্যমে স্থানীয় যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান ও ভাগ্য বদলের কথা ছিল।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি এখনো সচল করা সম্ভব। এতে এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে তার আগে প্রয়োজন প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ, ব্যর্থতার কারণ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘অতিরিক্ত বরাদ্দ এনে প্রকল্পটি সচল করা যায় কি না, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিজে




