ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ জব্দের পর সাবেক হুইপ সামশুর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

সম্পদের অসংগতি ৫ কোটির বেশি

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র ও জমিসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সামশুল হক চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে খোলা ৩০টি হিসাবে প্রায় ১২ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্রে ১ কোটির বেশি টাকা এবং প্রায় ২ কোটি টাকার জমি আগেই অবরুদ্ধ করা হয়েছে। মোট প্রায় ১৫ কোটি টাকার বেশি সম্পদ ফ্রিজ করা হয়েছে।

পটিয়া প্রতিনিধি জানায়, সামশুল হক চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের প্রথম ধাপে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং তিনজনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। দুদক চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয় সূত্র জানায়, পরিবারের বাকি চার সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দ্রুত জমা দিতে কমিশন থেকে নির্দেশনা এসেছে। বুধবার (৪ মার্চ) এ–সংক্রান্ত একটি চিঠি দুদক চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয়ে পৌঁছায়। বিষয়টি বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেন দুদক চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন।

মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, প্রথম ধাপে সামশুল হক চৌধুরী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে সাতজনের মধ্যে তিনজনের নামে কয়েক মাস আগে চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছিল। এখন পরিবারের বাকি চার সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রতিবেদন দ্রুত জমা দিতে কমিশন থেকে জরুরি নির্দেশনা এসেছে। সেই অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পরবর্তী সময়ে কমিশন আইনগত ব্যবস্থা নেবে।

রোববার (৮ মার্চ) মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামশুল হক চৌধুরীর নামে মোট ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৭ হাজার ৯৫৭ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। বিপরীতে তার গ্রহণযোগ্য ও বৈধ আয় পাওয়া গেছে ৪ কোটি ৯০ লাখ ১৩ হাজার ৯৫৬ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলে তার প্রকৃত সঞ্চয় হওয়ার কথা ছিল ১ কোটি ৭৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬২ টাকা। অর্থাৎ তার আয়ের তুলনায় ৫ কোটি ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৫ টাকার বেশি সম্পদের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে সামশুল হক চৌধুরীর স্ত্রী কামরুন নাহার চৌধুরীর নামেও বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তার নামে ৭ কোটি ২১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ টাকার সম্পদ পাওয়া গেলেও বৈধ আয় ও সঞ্চয়ের ভিত্তিতে তার সম্পদের পরিমাণ হওয়ার কথা ছিল ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫৮৩ টাকা। ফলে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০৩ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তার কন্যা তাকলিমা নাছরিন চৌধুরীর নামে ৩ কোটি ১ লাখ ৮১ হাজার ৯৬৯ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৮৮ হাজার ৭২৩ টাকার সম্পদের বৈধ উৎসের সঙ্গে অসংগতি রয়েছে বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

নামে-বেনামে সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের অভিযোগ

দুদক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ক্ষমতার অপব্যবহার করে নামে–বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সামশুল হক চৌধুরী ও তার পরিবারের সাত সদস্যের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়। দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২–এর তৎকালীন উপপরিচালক মো. আতিকুল আলমের স্বাক্ষরিত চিঠিতে ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, লকার ও অন্যান্য আর্থিক তথ্যের সত্যায়িত কপি চাওয়া হয়।

পরিবারের অন্য সদস্যরা হলেন তার স্ত্রী কামরুন নাহার চৌধুরী, ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন, মেয়ে তাকলিমা নাছরিন চৌধুরী ও তাহমিনা নাসরিন চৌধুরী এবং ছোট ভাই ফজলুল হক চৌধুরী মহব্বত ও মজিবুল হক চৌধুরী নবাব।

দুদক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক এমপি, মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সাবেক এমপি সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্যাসিনো ব্যবসায় সম্পৃক্ততা, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নামে–বেনামে সম্পদ অর্জন এবং বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়।

এর আগে গত বছরের ২ অক্টোবর ক্যাসিনো ব্যবসায় সম্পৃক্ততা, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অভিযোগে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার তথ্য রয়েছে।

এর আগে ২০২৩ সালের ৮ মে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় দুদকের তৎকালীন সচিব মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ না পাওয়ায় অব্যাহতির কথা বলা হয়।

রাজনৈতিক পরিচিতি ও বিতর্ক

সামশুল হক চৌধুরী রাজনীতিতে শুরুতে যুবদল ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও একই আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদের হুইপের দায়িত্ব পান।

২০১২ সালের জানুয়ারিতে সরকারি ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম পুলিশের এক পরিদর্শক অভিযোগ করেন, তিনি ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং কিছু পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে মিলিত হয়ে সেখান থেকে অর্থ আদায় করতেন। ওই অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট পরিদর্শককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন।

একই বছরের অক্টোবরে দুদক সামশুল হক চৌধুরীসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে তদন্ত ঘোষণা করে এবং নভেম্বরে তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের অভিযানে জুয়ার কার্ড উদ্ধারের ঘটনাও আলোচনায় আসে। তার ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের একটি ফোনালাপ ফাঁস ও অস্ত্রসহ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সামশুল হক চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য বা সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ksrm