বেতন চাইতে এসে মার খায় রিজেন্ট টেক্সটাইলের পোশাকশ্রমিকরা, মাসে মাসে একই কাণ্ড

রোজার ঠিক আগে কারখানাই বন্ধ করে দেওয়া হল

1

দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক ঠকিয়ে আসছে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হাবিব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিজেন্ট টেক্সটাইল মিল। শ্রম আইন মানা তো দূরের, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতনও দেওয়া হয় নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে অনেক কম। এর বাইরে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে আরও নানা অনিয়ম। এসব নিয়ে মুখ খুললেই হারাতে হয় চাকরি। ওই কারখানায় প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করেন।

অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে শেয়ারবাজারে এসেছিল রিজেন্ট টেক্সটাইল। অথচ সর্বশেষ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে শেয়ারবাজারে এসেছিল রিজেন্ট টেক্সটাইল। অথচ সর্বশেষ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

রিজেন্ট টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী মন্টু এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবিব। সালমান হাবিব চট্টগ্রাম চেম্বারেরও পরিচালক। এর অন্য পরিচালকরা হলেন— ইয়াসিন আলী, মাশরুফ হাবিব, তানভীর হাবিব এবং ইয়াসিন হাবিব।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কালুরঘাট এলাকায় অবস্থিত রিজেন্ট টেক্সটাইল শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। সর্বশেষ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের পাঁচ পরিচালককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

বেতন চাইতে এসে মার খায় রিজেন্ট টেক্সটাইলের পোশাকশ্রমিকরা, মাসে মাসে একই কাণ্ড 1

Yakub Group

রিজেন্ট টেক্সটাইলে কর্মরত শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন, ওই কারখানায় শ্রম আইন অনুসরণ করা হয় না। সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ৮৩০০ টাকা হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ বেতন দেয় ৬ হাজার টাকা। বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির নিয়ম থাকলেও সেটা মানা হয় না। এছাড়া ওভারটাইম ও মাসিক বেতনও নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা হয় না। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হয়।

হাবিব গ্রুপের এই পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানে চলে আসা অনিয়মে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে নিতান্তই বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা আন্দোলনে যান। গত বছরের আগস্টেও রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলের শ্রমিকরা কারখানার মূল ফটকে তালা লাগিয়ে সারা দিন ধরে পালন করে অবস্থান কর্মসূচি।

এর ঠিক সাত মাস পর এবার আবার একই কাণ্ড। সোমবার (৪ এপ্রিল) চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে বকেয়া বেতনের দাবিতে দিনভর বিক্ষোভ করলেন রিজেন্ট টেক্সটাইলের শ্রমিকরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করেন। পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ঘে জড়ান তারা।

শ্রমিকরা বলেন, বেতন দেবে বলে ডেকে এনে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে আমাদের রক্ত ঝরালো। রোজার মাসে এমন অমানবিক নির্যাতন কোনো মানুষ করতে পারে না।

এমন পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রিজেন্ট টেক্সটাইলের উপমহাব‍্যবস্থাপক ইমতিয়াজ শ্রমিকদের জানান, ব‍্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবীবের তরফ থেকে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ১২ এপ্রিল দেওয়া হবে এবং মার্চের বেতন কত তারিখে দেওয়া হবে সেটা ১২ এপ্রিল জানিয়ে দেওয়া হবে।

কিন্তু বেতন নিয়ে বারবার বঞ্চনার শিকার হওয়া শ্রমিকরা ওই ঘোষণা মানতে অস্বীকৃতি জানান। তারা একইসঙ্গে তিন মাসের বেতন পরিশোধের দাবি জানান।

জানা গেছে, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিল গত ফেব্রুয়ারি থেকেই লে-অফ বা বন্ধ অবস্থায় আছে। গত ১৬ মার্চ কর্তৃপক্ষ দুই মাসের বেতন বকেয়া রেখেই কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। পরে আন্দোলনের মুখে ৩ এপ্রিল কারখানার কাজ চালু করে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় মালিকপক্ষ। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে শ্রমিকরা বেতন নিতে আসলে কর্তৃপক্ষ আবারও গড়িমসি করে ৪ এপ্রিল (সোমবার) কারখানায় আসতে বলে। মালিকপক্ষের কথামতো সোমবার (৪ এপ্রিল) কারখানায় গেলেও শ্রমিকদের কারখানায় প্রবেশ করতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, কারখানা লে-অফ ঘোষণা করা হলেও নিয়ম অনুযায়ী বেতনভাতা পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওই হিসেবে শ্রমিকরা ফেব্রুয়ারি থেকে তিন মাসের বেতন পাওনা রয়েছে।

জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতেও বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকরা ধরনা দিতে থাকেন মালিকপক্ষের কাছে। পরে এটি আন্দোলনে রূপ নিতে থাকলে বোয়ালখালীর স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সাময়িক মীমাংসা করা হয়েছিল।

এর আগে গত বছরের আগস্টেও রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। ওই বছরের ১৯ আগস্ট থেকে নির্ধারিত সময়ে বেতন দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শ্রমিকেরা। পরে রিজেন্ট টেক্সটাইলের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে কর্মবিরতি পালন করেন মিলের প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক। ওই সময় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শিল্প পুলিশ ও বোয়ালখালী থানা পুলিশের একাধিক টিম অবস্থান নেয় কারখানা এলাকায়। পরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমানের আশ্বাসে আন্দোলন থেকে সরে যান শ্রমিকরা। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে মালিকপক্ষ ও প্রশাসনসহ ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে কিছু দাবি মেনে নেওয়া হলে ৩০ ঘণ্টা পর কাজে যোগ দেন শ্রমিকরা।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

1 মন্তব্য
  1. নেওয়াজ বলেছেন

    রক্তসুচা মালিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm