বৃষ্টির অভাবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে মরে যাচ্ছে ধানের চারা, কৃষকের খরচ বেড়ে গেছে তিনগুণ

আমনে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা

অনাবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কৃষকরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। ধান চাষে এবার বর্ষায় অনাবৃষ্টির কারণে বীজতলা তৈরির সময় থেকেই নানা সংকটে পড়তে হয়েছে কৃষকদের। একইসঙ্গে ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধি ও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা সংকটকে ঘনীভূত করেছে। এর বাইরে রয়েছে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি। এসব কারণে চলতি মৌসুমে আমন আবাদের পাশাপাশি উৎপাদনও কমে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। খরচ বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ। একইসঙ্গে কমেছে আমনের আবাদ।

কৃষি বিভাগের হিসাবে ৩১ আগস্টের মধ্যে আমনের চারা রোপণ শেষ করতে হবে। শুধু রোপণ নয়, ধানের চারা বেড়ে ওঠার সময় সেপ্টেম্বর নাগাদও জমিতে পর্যাপ্ত পানি থাকতে হবে। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় পর্যাপ্ত পানি নেই জমিতে।

বৃষ্টির অভাবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে মরে যাচ্ছে ধানের চারা, কৃষকের খরচ বেড়ে গেছে তিনগুণ 1

আমনের বীজতলা তৈরির উপযুক্ত সময় বাংলা বর্ষপঞ্জির জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে এবার কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মিলেনি। শ্রাবণ মাস শেষ হলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চাষাবাদের শুরুতে বীজতলা নিয়েই শঙ্কা দেখা দেয়। সেচ পাম্প দিয়ে বীজতলা তৈরির কাজে এখন বড় বাধা লোডশেডিং। তার ওপর বাড়ানো হয় ইউরিয়া সার ও জ্বালানি তেলের দাম। বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে কৃষি-শ্রমিকরাও বাড়তি মজুরি দাবি করে। পর্যাপ্ত পানির অভাবে প্রথম দফায় অনেকের বীজতলা নষ্ট হয়ে যায়।

এছাড়া নির্ধারিত সময়ের ব্যবধানে আবাদি জমি প্রস্তুত করতে না পারার কারণে চারা রোপণ করাও সম্ভব হয়নি। অথচ আমনের বীজতলা তৈরির ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই জমিতে চারা রোপণ করতে হয়। চারার বয়স বেড়ে গেলে ফলন ভাল হয় না।

Yakub Group

বিভিন্ন উপজেলার প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা জানান, বিলম্ব হলেও শ্যালো মেশিন বা অগভীর নলকূপের সেচ দিয়েই এবার আমন ধানের চাষাবাদ চলছে। বৃষ্টি না হওয়ায় শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে রোপা আমনের জমি। তিন-চারদিন পর পর পানি দিয়েও মাটি ভিজিয়ে রাখা যাচ্ছে না। প্রখর রোদের কারণে দ্রুত মাটি ফেটে যাওয়ায় সেচের পানি বেশি লাগছে। ফলে বাড়ছে চাষের খরচ। এবার প্রতি শতকে ৪০ টাকা কিংবা ঘণ্টায় ১৭০ টাকা হিসাবে সেচ দিয়ে জমি ভেজাতে হচ্ছে। বর্ষায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বাধ্য হয়েই সেচ দিয়ে আমন মৌসুমের চাষাবাদ করতে হচ্ছে। কাটা-মাড়াইয়ের খরচ বাদে আমন চাষে এবার প্রতি ৪০ শতকে খরচ হচ্ছে ১৩ হাজার টাকা। খরচ বেড়ে যাওয়ায় আবাদি জমির পরিমাণ কমে গেছে।

দেশের ‘শস্যভাণ্ডার’ হিসেবে পরিচিত রাঙ্গুনিয়ার গুমাই বিল, বোয়ালখালীর বগাচরা ও মইঘ্যার বিলে আমন আবাদ কম হয়েছে। এরমধ্যে বগাচরার ৩০০ একর জমির মধ্যে আমনের চাষ হয়েছে মাত্র ৫০ একর জমিতে। একইভাবে মইঘ্যার বিলে ১০০ একর জমির মধ্যে ৫০ একর জমিতে চাষ হয়েছে। স্বাভাবিক আবহাওয়ায় চাষ হলে যে খরচ হওয়ার কথা এবার সেই তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ খরচ বেড়ে গেছে। এছাড়া উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। চলতি আমন মৌসুমে দৈনিক আট-নয়শ’ টাকা মজুরি দিয়েও কৃষি শ্রমিক মিলছে না। বিভিন্ন স্থানে দৈনিক এক হাজার টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের কাজ করাতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আওতাধীন পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলায় গত মৌসুমে মোট পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছিল। এরমধ্যে উফশী জাতের চার লাখ ৮৮ হাজার ২২৯, স্থানীয় ৭৩ হাজার এবং হাইব্রিড জাতের আমন ধান আবাদ করা হয়েছিল ১১ হাজার ৫১৬ হেক্টর জমিতে। যদিও পূর্ববর্তী মৌসুমের তুলনায় এক হাজার ৬৫৩ হেক্টর কম জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় তিন জাতের আমনের আবাদ হয়েছিল এক লাখ ৮২ হাজার ৬৭১ হেক্টর। তার আগের বছর এ জেলায় আমন আবাদ হয়েছিল এক লাখ ৮৫ হাজার ৩১৯ হেক্টর জমিতে। গত মৌসুমে কেবল চট্টগ্রাম জেলায় আমনের আবাদ কমেছিল দুই হাজার ৬৪৮ হেক্টর জমিতে।

চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যেই ৭৫ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামে জোয়ারের চাপ থাকায় আমন আবাদে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। তাছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলে আমন আবাদ এমনিতেই কিছুটা দেরিতে হয়। বর্তমানে চারা রোপণের শেষ সময় চলছে।’

কক্সবাজারের পেকুয়ায় সরেজমিনে দেখা গেছে, অনাবৃষ্টির কারণে আমন চাষের ফলন বিপর্যয়ের শংকা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির পানির অভাবে জমিতে রোপিত আমন ধানের চারা মারা পড়ছে। প্রচন্ড তাপদাহ ও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে ফসলী জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এতে করে উপজেলার পেকুয়ায় আমন চাষের আবাদ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ফলে কৃষকরা জমিতে সম্পূরক সেচের মাধ্যমে আমন ধানের চারা রোপণ করেছে।

আকাশে বৃষ্টি না থাকায় এসব চারা রোদে শুকিয়ে মারা পড়ছে। ধানের চারাগুলো এখন ফসলী বিলে হলদে রং ধারণ করেছে। আবার কিছু কিছু জায়গায় কৃত্রিম পানীয়ও সেচ দ্বারা জমিতে ফসল ফলানো হয়েছে। অতিরিক্ত তাপদাহের কারণে এসব ফসলগুলিও লালচে ও মরিচা রং ধারণ হয়েছে। ফসলগুলোতে মড়ক ও ছত্রাকের মত জটিল রোগ আক্রান্ত হচ্ছে।

কিছু কিছু জমিতে দেখা গেছে, ধানের চারায় গুটি এসেছে। চারাগুলি স্ট্যাবিলিস্ট সময় পার করেছে। এসব ফসলগুলোতেও আবার ছত্রাক ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার টইটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং, বড়বিল, টৈইট্যাখালি বিল, কাচারীঘোনা ও নিত্যান্ত ঘোনাসহ অনেক স্থানের ফসলী জমিতে লবণাক্ততা গ্রাস করেছে। সমুদ্রের লোনা পানি নিন্মাঞ্চলে প্রবেশ করে। এতে করে ওই ইউনিয়নের ৫ থেকে ৬টি ফসলী বিলে আমন ধানের চারা মারা পড়ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, টইটংয়ের নিত্যান্ত ঘোনায় বিলে মারা পড়ছে আমন ধানের চারা। একই ইউনিয়নের কাচারীঘোনায়ও জমির সদ্য রোপিত আমন চারা বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ৩ নং ওয়ার্ডের টেইট্যাখালি বিলেও বিশাল অংশে ধানের চারা হলদে হয়ে গেছে। ওই বিল এখন ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। জালিয়ারচাং বড় বিলেরও একই অবস্থা। টইটং ইউপি ভবনের পূর্ব পাশে বড়পাড়া বিলে ধানের চারা মারা পড়ছে।

স্থানীয়রা জানান, টইটং খালের জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। জোয়ার-ভাটায় এসব বিলে লোনা পানি প্রবেশ করায় জমিতে মাটির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে মাটির রাসায়নিক ভৌত নষ্ট হয়ে গেছে। এতে করে ধানের চারাগুলি মারা পড়ছে।

টইটং কাচারীঘোনার কৃষকরা জানান, এরশাদ আলী ওয়াকফ থেকে জমি লাগিয়ত নিয়েছেন। একসনা চাষ করতে প্রতি কানি জমির ওয়াসিলা ধার্য আছে ৬ হাজার টাকা। কার্যকার করা ওই টাকা চাষীদের কাছ থেকে কয়েক দফায় উত্তোলন করেন। চলতি বর্ষা মৌসুমে ওয়াকফের জমিতে তারা চাষ করছিলেন। তবে ধানের চারা রোপণের ১ সপ্তাহের মধ্যে জমিতে আমন রোপা মরে যাচ্ছে। এখন তারা এ ক্ষতি কিভাবে পোষাবে— সেই চিন্তায় আছেন।

চাষী নুরুল হক জানান, প্রাকৃতিক সমস্যার কারণে এ বছর জমি থেকে ফসল তোলা প্রায় অনিশ্চিত। পাওয়ার টিলার বাবদ প্রতি কানিতে আড়াই হাজার টাকা, আগামসহ আনুসাংগিক ব্যয় প্রতি ৪০ শতকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। চাষী আক্তার আহমদ জানান, আমরা চরম সংকটে মধ্যে রয়েছি।
চাষী নুরুল আলম সর্দার জানান, মানুষ এ বছর ধান পাবেনা জমিতে। নিত্যান্ত ঘোনার চাষী জসিম উদ্দিন, হুমায়ুন কবির, নুর হোসেন, জিয়াবুল হকসহ আরো অনেকে জানান, ছনুয়া নদীর জোয়ারের পানি ডাকাত্যাঘোনা নাশি দিয়ে বিলে ঢুকেছে। বৃষ্টি হচ্ছে না তাই এখন রোপা মারা পড়ছে।

এদিকে পেকুয়ার ৭ ইউনিয়নে আমনের ফলন বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। উঁচু স্থানের অনেক জমি এখনো অনাবাদি থেকে গেছে। আকাশ থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় এসব জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। সদরের জালিয়াখালী, বকসুচৌকিদারপাড়া, বটতলীয়াপাড়াসহ দক্ষিণ ও পশ্চিম অংশের অনেক জমিতে এখনো ফসল ফলানো যায়নি। মগনামা, উজানটিয়া ইউনিয়নেও একই অবস্থা। রাজাখালীসহ উপকুলবর্তী ৩ টি ইউনিয়নে প্রতি বছর বর্ষার সময় লবণ মাঠের জমিতে প্রচুর ধান চাষ হতো। অনাবৃষ্টির কারণে এ বছর এ সব জমিতে চাষাবাদ করা যায়নি। বারবাকিয়া ইউনিয়নেও আংশিক জায়গায় অনাবাদি থেকে গেছে চাষাবাদ। কাদিমাকাটা, বারাইয়াকাটা অংশে জমির ফসল হলদে রং ধারণ করেছে।

পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তপন কুমার রায় জানান, যে সব জায়গায় লবণাক্ততা বেড়ে গেছে সেখানে বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এর সমাধান আসবে না। বৃষ্টি হতে হবে। আমরা সম্পূরক সেচের পরামর্শ দিচ্ছি।

পেকুয়ার ইউএনও পূর্বিতা চাকমা জানান, রাবার ড্যাম সচল করা হয়েছে। মিষ্টি পানির উৎস সমুহে যাতে লোনা পানি প্রবেশ না করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরশাদ আলী ওয়াকফের অফিসিয়াল মোতোওয়াল্লী হিসেবে বলছি যারা আমাদের জমি চাষ করছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে আমাদেরকে লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে।

ডিজে/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm