বিষাক্ত গ্যাসে ৯ প্রাণ গেল সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে, ছুটির দিনে সেফটি ছাড়াই চলছিল কাজ
বিপজ্জনক কারখানায় ‘গ্রিন’ তকমা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মোট নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের বিষক্রিয়ায় একজন সাংবাদিকও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ এই ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং কারখানাটি ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তরিত হয়েছে বলে এর আগে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন সীতাকুণ্ড উপজেলার আকবর আলীর হাট এলাকার মোহাম্মদ সেকান্দরের ছেলে মোহাম্মদ মনসুর ও মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, খাদেম পাড়া এলাকার আব্দুল মালেকের ছেলে হাবিবুর রহমান, ভাটিয়ারির শনি ঠাকুর পাড়া এলাকার হবেন্দ্র দাসের ছেলে পলাশ দাস ও প্রদীপ দাসের ছেলে সানি দাস।
নিহত অপর শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন পাবনার সুজানগর থানার ছৈয়দপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন, গাইবান্ধার সদর থানার উত্তর কুপতলা এলাকার মোহাম্মদ হারুন মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ রানা মিয়া এবং একই জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার মোহাম্মদ রানা মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ খোকন মিয়া।
এ ছাড়া মোহাম্মদ শরীফ নামে আরও এক শ্রমিক চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে মারা গেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পান তাঁরা। পরে সেখানে গিয়ে কয়েকজন শ্রমিককে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। তাঁদের গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।
তীব্র গ্যাসের গন্ধ, খালে ঢুকতে পারেননি জেলেরা
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারখানার ভেতর থেকে বের হওয়া গ্যাসের গন্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা কারখানাটির পাশের খালে প্রবেশ করতে পারেননি। তাঁদের অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে ঘাটে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুরু হয়। তাঁরা কারখানা এলাকায় গিয়ে দেখেন, অসুস্থ কয়েকজনকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। পরে জাহাজের ভেতরে কয়েকজনের মৃতদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুক্রবার কারখানাটি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও শ্রমিকদের দিয়ে ইয়ার্ডে কাজ করানো হচ্ছিল। কাজ চলার সময় সেফটি টিমের সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে তাঁরা দাবি করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের দাবি, এটি মালিকপক্ষের গাফিলতি। বন্ধের দিনও সেখানে কাজ চলছিল। বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দুই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসকে খবর
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ইয়ার্ডে একটি জাহাজে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে ঘটনার দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পর সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসকে বিষয়টি জানানো হয়।
ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, ইয়ার্ডের সেফটি টিম প্রথমে একটি ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস নির্গমন হতে দেখে। পরে সেফটি টিমের কয়েকজন সদস্য গ্যাস লিকের বিষয়টি পরীক্ষা করতে গেলে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।
সিপি




