বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সঙ্গে সুফিবাদের আধ্যাত্মিক দর্শনের সংযোগ ঘটিয়ে ব্যতিক্রমী ‘গ্রাজুয়েট সিম্পোজিয়াম’ অনুষ্ঠিত হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি)। বিশ্ব পরিবেশ দিবস এবং হযরত শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)–এর ২০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার (২৭ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সম্মেলনকক্ষে দিনব্যাপী এ আয়োজন করা হয়।

চবির ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ এবং দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ডিরি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘গ্রাজুয়েট সিম্পোজিয়াম অন ওয়ার্ল্ড এনভায়রনমেন্ট ডে-২০২৬’-এ প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ও রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম।
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিম্পোজিয়ামে বিশেষ অতিথি ছিলেন চবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এএম মাসুদুল আজাদ চৌধুরী এবং ডিরির ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও চেয়ারম্যান শাহজাদা সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী। সিম্পোজিয়ামের কনভেনার ছিলেন অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার এবং কো-কনভেনার ছিলেন শাহজাদা সৈয়দ ইরফানুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিকতাকে যুক্ত করার উদ্যোগ সময়োপযোগী। তাঁর ভাষায়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু কার্যক্রমে বৈজ্ঞানিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের গবেষণা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন ও জিআইএস নিয়ে গবেষণা করছেন। দীর্ঘ গবেষণা জীবনে অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেও পরিবেশের অবক্ষয় রোধে মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশের মানুষ সাধারণত নিজের ওপর সংকট না আসা পর্যন্ত পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হন না। তিনি শিক্ষার্থীদের পোস্টার উপস্থাপনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রশংসা করে পরিবেশ রক্ষার বার্তা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান বিশ্বে মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় হুমকি জলবায়ু পরিবর্তন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এ ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে দেশের নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদিও এ সংকটের জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। নির্বিচারে বন উজাড় ও কার্বন নিঃসরণের কারণেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে বেশি বেশি গাছ লাগানোর আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিম্পোজিয়ামের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার। ডিরির পক্ষে বক্তব্য দেন মেম্বার সেক্রেটারি ড. কাজী সাইফুল আচফিয়া। মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় অংশ নেন ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ ও অধ্যাপক ড. মো. আতিকুর রহমান, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহীনুর রহমান, বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এএইচএম. রায়হান সরকার, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি মোহাম্মদ শের মাহমুদ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনমুন নেছা চৌধুরী।
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাজ সুলতানা ও প্রভাষক মোহাম্মদ আলীর যৌথ সঞ্চালনায় আয়োজিত সিম্পোজিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন।
সিম্পোজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিক্ষার্থীদের পোস্টার উপস্থাপনা প্রতিযোগিতা। ‘পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু অভিযোজন’ এবং ‘সুফিবাদ, পরিবেশবিদ্যা ও সবুজ ভবিষ্যৎ’—এই দুই বিষয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ইকো-সুফিবাদ ও পরিবেশগত নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের গবেষণাভিত্তিক পোস্টারে তুলে ধরা হয়। আয়োজকেরা জানান, প্রতিটি বিভাগ থেকে সেরা তিনটি পোস্টারকে পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং সিম্পোজিয়ামের আলোচনার ভিত্তিতে একটি প্রসিডিংসও প্রকাশ করা হয়েছে।




