বিশ্বকাপের উত্তেজনা, পরীক্ষার চাপ আর এক সমর্থকের গল্প
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে অন্যরকম উন্মাদনা। বাঙালিদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে কখনো কখনো মনে হয়, এই দুটি দল ছাড়া যেন বিশ্বকাপে আর কোনো দলই নেই। অবশ্য কথাটি মজা করেই বললাম। বাস্তবে বিশ্বকাপ ঘিরে এখন সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে এক অন্যরকম উত্তেজনা। কেউ বিশ্বাস করছেন, এবার শিরোপা যাবে আর্জেন্টিনার হাতে। কেউ আবার মনে করছেন, ব্রাজিলেরই সময় এসেছে। অনেকের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডও।
এতসব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও আমার চাওয়া একটাই। আমি চাই, আমার আইডল ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ সিআরসেভেনের হাতেই এবার বিশ্বকাপ উঠুক। জানি, অনেকের কাছে এই প্রত্যাশা অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবু স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই।
২০২২ সাল থেকে টেলিভিশনের পর্দায় নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখা শুরু করি। একের পর এক ম্যাচ দেখতে দেখতে ফুটবলের নানা কৌশল ও পরিভাষার সঙ্গে পরিচিত হই। আর সেই পরিচয় থেকেই জন্ম নেয় ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা। ক্রিকেটপ্রেমী দেশের মানুষ হয়েও ক্রিকেট আমার তেমন দেখা হয় না। এ কথা শুনে হয়তো অনেকেই বিরক্ত হতে পারেন। তবে আমার আগ্রহ বরাবরই ফুটবলে। লা লিগা, প্রিমিয়ার লিগ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা কোপা আমেরিকার ম্যাচ আমি দারুণ আগ্রহ নিয়ে দেখি। ক্লাব ফুটবলে আমার প্রিয় দল রিয়াল মাদ্রিদ। এই দলের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার অসংখ্য আবেগ, কখনো আনন্দের অশ্রু, কখনো হতাশার।
অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘মেয়ে মানুষ আবার ফুটবল দেখে!’ কেউ কেউ এটিকে বাড়াবাড়ি বলেও মনে করেন। কিন্তু নিজের আগ্রহ বা ভালোবাসার জন্য অন্যের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার প্রয়োজন আমি অনুভব করি না।
এবারের বিশ্বকাপ ছিল অনেক বড় পরিসরের। ৪৮টি দেশ ও ১০৪টি ম্যাচ নিয়ে এমন আয়োজন সত্যিই ব্যতিক্রমী। এখন টুর্নামেন্ট প্রায় শেষের পথে। রাউন্ড অফ ৩২ শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে মেসির হ্যাটট্রিক, ভোজিনহার চমক, রোনালদোকে ঘিরে সমালোচনা, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে তাঁর ব্রেস, নেইমারের তুলনামূলক কম মাঠে নামা এবং ঘানার বিপক্ষে হ্যারি কেনকে বেঞ্চে রাখা—সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টের ঘটনাগুলো যেন খুব দ্রুতই ঘটে গেল।
মনে হয়, এই তো সেদিন শাকিরার ‘দাই দাই’-এর তালে বিশ্বকাপের পর্দা উঠল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের সন্তান সঞ্জয়ের পরিবেশনা বাংলাদেশের জন্য ছিল গর্বের মুহূর্ত। তাঁর পোশাকে ফুটে ওঠা বাংলাদেশের প্রতীক বারবার টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠছিল। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের সামনে তাঁকে দেখে ভালো লাগছিল আরও বেশি। ব্যক্তিগতভাবেও তাঁর প্রতি আমার আগ্রহ রয়েছে, কারণ তিনি আমার এলাকার, লাভলেইনেরই সন্তান।
এবার আমি পর্তুগালের সমর্থক। প্রথম ম্যাচে ড্র করার পর পুরো সপ্তাহ মন খারাপ ছিল। তবে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে হারানোর পর সেই হতাশা অনেকটাই কেটে যায়। রোনালদোকে নিয়ে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল করা হয়, তা আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। বিশ্বকাপ এলেই কিছু মৌসুমি সমর্থক নানা মন্তব্য শুরু করেন। তাঁদের কেউ বলেন, ‘রোনালদো বুড়ো হয়ে গেছে, এখন আর খেলতে পারে না।’ বয়স অবশ্যই বেড়েছে। কিন্তু তাঁর সামর্থ্যকে শুধু বয়স দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। মাস কয়েক আগে আল-নাসরের হয়ে তাঁর করা স্মরণীয় বাইসাইকেল কিক তারই প্রমাণ। ৪১ বছর বয়সেও তিনি যেভাবে মাঠ দাপিয়ে বেড়ান, তা অনেক তরুণ ফুটবলারের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।
আমার দাদি প্রায়ই বলেন, ‘কোনো খেলোয়াড় খারাপ নয়, সবাই দক্ষ।’ আমি তাঁর সঙ্গে একমত। খেলাকে খেলার জায়গাতেই রাখা উচিত। অনেক ব্রাজিল সমর্থক মেসিকে ‘পেসি’ বলে কটাক্ষ করেন, আবার অনেক আর্জেন্টিনা সমর্থকও ব্রাজিলকে নিয়ে বিদ্রূপ করেন। এসবের চেয়ে নিজের প্রিয় দলের জন্য শুভকামনা জানানোই অনেক বেশি সুন্দর।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই শোনা যায়, মেসি বা রোনালদো ছাড়া তাঁদের দল কিছুই নয়। অথচ একজন স্ট্রাইকারের প্রধান দায়িত্বই হলো গোল করা। তাই শুধু গোল করার কারণে তাঁদের সমালোচনা করার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে খাটো করার এই প্রবণতা আমাদের সমর্থকদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।
এখন অপেক্ষা শুধু শেষ বাঁশির। পর্তুগাল যদি শিরোপা জিততে না পারে, তখন কেমন লাগবে জানি না। তবু চাই, বিশ্বকাপ হোক সুন্দর প্রতিযোগিতার, আর জয় হোক ফুটবলের।
বিশ্বকাপের উত্তেজনার পাশাপাশি চলছে আমাদের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। একদিকে প্রিয় দলের খেলা, অন্যদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি। দুটোই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। তবু অপেক্ষা ২০ জুলাই ২০২৬-এর। সেদিন যদি আমার প্রিয় দলের হাতেই বিশ্বকাপ ওঠে, তবে আনন্দটা হবে অন্য রকম।
লেখক: শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণি (বিজ্ঞান), বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, চট্টগ্রাম।




