বিমানে ওঠার আগেই থামল চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্মকর্তাদের ‘আমেরিকা বিলাস’
প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়ল সরকারের
চট্টগ্রাম নগরীর গ্রাহকদের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়ানো সেই ডিজিটাল মিটারের নাম করে ঠিকাদারের টাকায় আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন ছিল। পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কেউ কেউ যখন ব্যাগ গুছিয়ে ঢাকার পথে, ঠিক তখনই উড়ে এল দুঃসংবাদ। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যে উড়োজাহাজে চড়ে কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল, সেই যাত্রা স্থগিত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
গত বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম প্রতিদিনে ‘কাজ শেষ, তবুও প্রশিক্ষণের নামে ঠিকাদারের টাকায় চট্টগ্রাম ওয়াসায় আমেরিকা বিলাস’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়ে প্রশাসনের, যার ফলে শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যায় বহুল আলোচিত এই সফর।
স্থগিত হলো বিমানযাত্রা
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ডিজিটাল মিটার সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারিগরি ও সফটওয়্যার প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আমেরিকা যাওয়ার তালিকায় ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান। তাদের সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন প্রতিনিধিরও সফরসঙ্গী হওয়ার কথা ছিল। গত বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) এই সফরের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ওই দিনই স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সফর বাতিলের নির্দেশ দেয়া হয়। সেই আদেশের বার্তা পৌঁছায় চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগমের কাছে। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সফর বাতিলের বিষয়টি জানিয়ে দেন।
কর্মকর্তাদের প্রস্তুতির মাঝেই হতাশা
সফরের জন্য কর্মকর্তারা আগেভাগেই বিমানের টিকিট কেটেছিলেন। ব্যাগ গুছিয়ে কেউ কেউ পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনাও হয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার একজন কর্মকর্তা জানান, সংবাদ প্রকাশের কারণে তিন কর্মকর্তার সব আয়োজন ভেস্তে গেছে। তারা ব্যাগ গুছিয়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিমানে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাদের আমেরিকা সফর বাতিল হয়ে গেল।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বিধিমালা ও বিতর্ক
প্রকল্পের প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের এই বিদেশযাত্রা নিয়ে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। যে ডিজিটাল মিটার স্থাপনের প্রশিক্ষণে তারা যাচ্ছিলেন, সেই কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এমনকি পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টির চার বছরই পার হয়ে গেছে। খোদ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ পরিহারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও কর্মকর্তারা তা তোয়াক্কা করেননি। বিশেষ করে তিনজনের মধ্যে দুজন কেন কারিগরি জ্ঞানহীন বা ভিন্ন বিভাগের, সে বিষয়েও স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে কর্মকর্তাদের উগান্ডা সফর নিয়েও ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল।
গ্রাহক ভোগান্তি ও ভবিষ্যৎ
বর্তমানে ওয়াসার এই ডিজিটাল মিটার নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, স্মার্ট মিটার লাগানোর পর থেকে পানির বিল আগের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেড়ে গেছে। কোথাও কোথাও আবার অস্বাভাবিক কম বিল আসছে। এসব অভিযোগের পরও কোনো সমাধান মেলেনি। এই অব্যবস্থাপনার মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উইংস ইনভেস্টমেন্ট এলএলসির অর্থায়নে কর্মকর্তাদের আমেরিকা সফরের পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াসার ভেতরেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একদিকে গ্রাহকদের বাড়তি বিলের বোঝা, অন্যদিকে ঠিকাদারের টাকায় কর্মকর্তাদের প্রমোদভ্রমণের এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল সরকারি হস্তক্ষেপে।
আইএমই/সিপি




