বিদেশ পালানোর আশঙ্কায় চট্টগ্রাম সিটির প্রকৌশলী দম্পতিসহ চারজনকে ঘিরে সরকারি সতর্কবার্তা
ঢাকা দক্ষিণের বোরহান-আনিছুরও তালিকায়
দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলাকালে গোপনে দেশ ছাড়তে পারেন, এমন আশঙ্কায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী দম্পতিসহ দেশের চার সিটি করপোরেশনের চার কর্মকর্তার বিদেশযাত্রা ঠেকাতে কড়া নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দেশত্যাগ রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন-১ শাখা থেকে গত ২৬ জুলাই এ-সংক্রান্ত একটি গোপনীয় চিঠি জারি করা হয়। যুগ্মসচিব মো. রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তদন্তাধীন কর্মকর্তারা হলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক এবং বর্তমানে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে বদলিকৃত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মাদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী, যিনি ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে বদলির আদেশাধীন রয়েছেন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তা, যিনি রংপুর সিটি কর্পোরেশনে বদলির আদেশাধীন রয়েছেন। সম্পর্কে শাহীন ও মুক্তা স্বামী-স্ত্রী।
গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে সরকারি চিঠিতে বলা হয়েছে, তদন্তাধীন এসব কর্মকর্তা গোপনে দেশ ত্যাগ করতে পারেন। এ অবস্থায় তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকায় তাঁদের বিদেশে যেতে না দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা আবেদন করেছেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চার কর্মকর্তার দেশত্যাগ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সরকারি চিঠির সঙ্গে চার কর্মকর্তার পাসপোর্ট-সংক্রান্ত তথ্যও সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের পাসপোর্টের মেয়াদ রয়েছে ২০৩২ সালের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক এবং বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশনে কর্মরত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের পাসপোর্টের মেয়াদ ২০৩৫ সালের ৩ আগস্ট পর্যন্ত। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তার পাসপোর্টের মেয়াদ ২০২৮ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত রয়েছে।
চিঠির অনুলিপি স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগ, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার একান্ত সচিব, সচিবের একান্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। মূল চিঠিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (স্পেশাল ব্রাঞ্চ), অতিরিক্ত ডিআইজি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ-ইমিগ্রেশন) এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে। দেশের সব ইমিগ্রেশন চেকপোস্টকে বিষয়টি অবহিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটির প্রকৌশলী দম্পতির বদলি নিয়ে যা ঘটেছিল
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্তাধীন প্রকৌশলী দম্পতির বদলি নিয়ে গত জুলাইয়ে নতুন মোড় নেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ায় স্থানীয় সরকার বিভাগ তাঁদের ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ কার্যকর করে। একই সময়ে বদলির আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী। পরে বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসাইনের বেঞ্চ রুল জারি ও স্থগিতাদেশ দেন। রিট পিটিশনের নম্বর ১০০৬৬/২০২৬।
এর আগে গত ২৩ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং তাঁর স্ত্রী, নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারজানা মুক্তাকে রংপুর সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়। ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তাঁরা যোগ না দেওয়ায় ২৭ জুলাই থেকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ কার্যকর হয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে গত ২৫ জুন চট্টগ্রামের বাসিন্দা মেহেদী চৌধুরী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ফাইল বাণিজ্য, ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে লিখিত আবেদন করেন।
বদলির পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে দুই কর্মকর্তার বদলির আদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তিনি তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বদলির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থে তাঁদের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেই রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
ঢাকা দক্ষিণের বোরহানের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ
গত ৫ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের এক অফিস আদেশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ পদোন্নতি, অনিয়মের মাধ্যমে তৃতীয় গ্রেডের সুবিধা গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত সচিব মুহা. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
এর মধ্যে গত ৮ জুলাই তাঁকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়। নতুন স্মারকেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ পদোন্নতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ঠিকাদারি গ্রহণের অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণের আনিছুরের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ
গত ৩০ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয়। একই দিনে তাঁকে বগুড়া সিটি করপোরেশনে একই পদ বা সমমানের শূন্য পদে বদলি করা হয়।
তদন্তের চিঠিতে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়। বদলির আদেশে প্রশাসনিক কারণে তাঁকে বগুড়া সিটি করপোরেশনে পদায়নের কথা বলা হয়।
সিপি




