বায়েজিদের খুনে মূল হোতাকে বাঁচাতে ‘বলির পাঁঠা’ এমদাদ!

0

ঘটনাক্রম

সন্ধ্যা ৬টা : শেরশাহ বিহারী মসজিদ গলির বাসা থেকে এমদাদকে ধরে বায়েজিদ থানা পুলিশ।
রাত ৭:৩০-৮টা : এলাকার সব সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে যাওয়া হয়।
রাত ২টা ১৫ : এমদাদকে বায়েজিদ থানা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাত ২টা ৩০ : বায়েজিদের মাঝিরঘোনা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন এমদাদ।

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদে রিপন হত্যামামলার আসামি এমদাদের ক্রসফায়ারের ঘটনা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়েছে ক্রসফায়ারে নিহত এমদাদের পরিবার। এমদাদকে ‘বলির পাঠা বানানো হয়েছে’ দাবি করে তারা বলছে ওপরমহলের নির্দেশে ঘর থেকে সন্ধ্যায় ধরে নিয়ে গিয়ে গভীর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে ‘হত্যা’ করা হয়েছে তাকে। তবে পরিবারের এই দাবিকে মিথ্যা বলে জানিয়েছে বায়েজিদ থানা পুলিশ।

বায়েজিদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রিটন সরকার চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) গ্রেফতারের পর এমদাদকে নিয়ে মাঝিরঘোনা এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে গেলে পুলিশের সঙ্গে এমদাদের সহযোগীদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এমদাদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে এমদাদের ভাই হান্নান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুলিশ আমার ভাইকে শেরশাহ বিহারী মসজিদ গলির বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে। মেয়ের জন্য তার অনেক টান ছিল। মেয়েকে দেখতে সে বাসায় এসেছিল। তাকে বিশাল টাকার বিনিময়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।’

সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরের অনুরাগী ছিলেন কথিত 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত এমদাদ। এমদাদকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ফোনে জানানো হলে মেয়র বলেছিলেন ‘তিনি দেখতেছেন’— দাবি পরিবারের।
সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরের অনুরাগী ছিলেন কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত এমদাদ। এমদাদকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ফোনে জানানো হলে মেয়র বলেছিলেন ‘তিনি দেখতেছেন’— দাবি পরিবারের।

এমদাদের ভাই বললেন, ‘রাত ২টা ১৫ মিনিটের দিকে তাকে থানা থেকে বের করে নিয়ে গেছে। নিয়ে গিয়ে মেরে ফেললো। ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘন্টা-দেড় ঘন্টা পরে পুলিশ এসে এলাকার সব সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নিয়ে গেছে। তখন আমাদের সন্দেহ হয়েছে। আমরা বিভিন্ন জায়গায় ফোন করেছি। মাননীয় মেয়র মহোদয় নাছির ভাইকে রাতের সাড়ে ৯টা বাজে কল করে জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, তিনি দেখতেছেন। আমি এসআই নাছিমকেও কল দিয়েছি। উনাকে বললাম আপনারা তো আমার ভাইকে ধরে নিয়ে গেলেন। তিনি (এসআই নাছিম) আমাকে প্রশ্ন করলেন, এই কথা আপনাকে কে বলছে? আমি বললাম সবাই দেখেছে, আপনি সন্ধ্যায় আমার ভাইকে ধরে নিয়ে গেছেন। তিনি তখন রাগ করে কল কেটে দিলেন। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভাইকে বাঁচাতে পারলাম না।’

Yakub Group

হান্নান বলেন, ‘এমদাদ পুলিশের তালিকাভুক্ত কোন সন্ত্রাসী না। এই হত্যামামলায় সে ৫ নাম্বার আসামি। তাকে কেন এভাবে মেরে ফেললো? অনেকে বলে ও কোটি কোটি টাকা কামাইছে। তাহলে ওর একাউন্ট চেক করুক না। ও যদি এত টাকা কামাতো তাহলে সে নাছিরাবাদে একটা ভাড়া বাসায় থাকতো না।’

তবে এমদাদের পরিবারের এসব দাবিকে অসত্য বলছে পুলিশ। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রিটন সরকার চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এসব কিভাবে সম্ভব? এগুলো সত্য নয়।’

এই বিষয়ে কথা বলতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার উপ পরিদর্শক গোলাম মো. নাছিম হোসেনকে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে নগরীর বায়েজিদের মাঝিরঘোনা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন এমদাদ। থার্টি ফার্স্ট নাইটে বায়েজিদের শেরশাহতে ঘটা রিপন হত্যামামলার এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। পুলিশ জানিয়েছে এমদাদের নামে বিভিন্ন অভিযোগে পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যামামলা ও একটি অস্ত্রমামলাও রয়েছে। ২০০৭ সালের হত্যামামলায় ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিলেন এমদাদ।

স্থানীয় সূত্র বলছে, বায়েজিদ এলাকায় বেশ প্রভাব নিয়ে রাজনীতি করতেন এমদাদ। কথিত যুবলীগ নেতা ও গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রক আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের অনুসারী ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসা, গার্মেন্টস থেকে চাঁদা সংগ্রহ করা, ফুটপাটের দোকান থেকে চাঁদা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে থাকা কিশোর গ্যাংগুলোর একটি পরিচালনা করতেন এমদাদ। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে বাঁচাতেই এমদাদকে তড়িঘড়ি বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। এতে চট্টগ্রামের একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার প্রচ্ছন্ন সায়ও ছিল।

এদিকে শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) আসরের নামাজের পর শেরশাহ এলাকায় এমদাদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm