বাঘের খাবারের টাকায় পিকনিক, চট্টগ্রামের সাবেক ডিসি ফরিদার দুর্নীতি খুঁজছে দুদক
চিড়িয়াখানার নথি তলব, ডেপুটি কিউরেটরকে নোটিশ
চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবস্থাপনা ঘিরে ওঠা অভিযোগের পর কমিশন চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মো. শাহাদাত হোসেন শুভর কাছে ব্যয়ের নথি, ব্যাংক হিসাব, চেক ও প্রশাসনিক অনুমোদনের কাগজপত্র জরুরি ভিত্তিতে তলব করেছে। একই সঙ্গে তাকে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় হাজির হওয়ার নোটিশও দেওয়া হয়। বাঘ–ভাল্লুকের খাবার আর আবাসন উন্নয়নের বদলে পিকনিকের বিজ্ঞাপন, দিবস উদযাপন ও ব্যক্তিগত অনুদানে ‘চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা উন্নয়ন ও প্রাণীকল্যাণ তহবিল’ থেকেই লাখ লাখ টাকা বিতর্কিত খাতে ব্যয়ের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ডিসি ফরিদা খানমকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয়। এর চার দিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর ডিসি পদ থেকে রিলিজ হওয়ার দিনই তাকে বদলি করা হয় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। তবে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে যোগ দেননি। এর মধ্যেই ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই আছেন বলে জানা গেছে।
গত বছরের ১৯ জুলাই ‘বাঘের খাবারের টাকায় চট্টগ্রামের ডিসির ‘পিকনিক’, চিড়িয়াখানার কোটি টাকা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় চট্টগ্রাম প্রতিদিনে।
দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো এক তাগিদপত্রে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সহকারী পরিচালক মনির মিয়ার নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এই দলের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগ বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিল করা।
অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ও সাক্ষী হিসেবে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মো. শাহাদাত হোসেন শুভর কাছে পাঠানো চিঠিতে অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার বিভিন্ন রেকর্ডপত্র ও তথ্য পর্যালোচনা করা একান্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে দুদক। সে কারণে জরুরি ভিত্তিতে সব নথির সত্যায়িত অনুলিপি সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
দুদকের তাগিদপত্র অনুযায়ী, ২০১২ সালে প্রণীত চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার গঠনতন্ত্র এবং সর্বশেষ সংশোধিত গঠনতন্ত্রের কপি চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে চিড়িয়াখানার ব্যয় নির্বাহের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি, ওই সময়ের নির্বাহী কমিটির সভাপতি, সদস্য সচিব ও সহসভাপতির নাম, বর্তমান পদবি ও ঠিকানা এবং ব্যয় সংক্রান্ত চেকে কার কার স্বাক্ষর ছিল, তার তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার সব ধরনের ব্যয় জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম ও চিড়িয়াখানা নির্বাহী কমিটির সভাপতির অনুমোদনে হয়—এ সংক্রান্ত আদেশ, পরিপত্র ও নীতিমালার সত্যায়িত অনুলিপিও পাঠাতে হবে।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংক পিএলসি, ওয়াসা কর্পোরেট শাখা, চট্টগ্রামে পরিচালিত ‘চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা’ নামীয় হিসাব নম্বর ০১০০০১৪৫৫২৮৭৬-এর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ের সিগনেটরি ও হিসাব পরিচালনাকারীর নাম-পদবি জানতে চাওয়া হয়েছে। ওই হিসাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট CDE-3608744, SBC-7281810, SBC-7281821, CDE-3608747, CDE-3608754, CDE-3608755, CDE-3608756, SBC-7281852, SBC-7281853 এবং SBC-7281874 নম্বরধারী চেকগুলোর সত্যায়িত কপি এবং এসব চেকের অর্থ কোন ব্যাংকের কোন হিসাবে জমা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্যও তলব করেছে দুদক।
এদিকে আলাদা নোটিশে দুদক জানিয়েছে, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ও সাক্ষী হিসেবে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মো. শাহাদাত হোসেন শুভর বক্তব্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। সে কারণে তাকে দুদকের কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
তহবিলের টাকা, প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়
১৯৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ২ একর জায়গা নিয়ে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা বর্তমানে ১০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। এখানে ৬৮ প্রজাতির ৫২০টি প্রাণী রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার দর্শনার্থী চিড়িয়াখানা দেখতে যান। বার্ষিক আয় ৭ কোটি টাকার বেশি।
এই আয় থেকে খরচ বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত অর্থ একটি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়, যা প্রাণী সংগ্রহ, আবাসন উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণে ব্যবহারের কথা। কিন্তু সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম ও চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফরিদা খানমের নির্দেশে ওই তহবিল থেকে প্রায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিভিন্ন বিতর্কিত খাতে ব্যয় হয়েছে। আইন সরাসরি লঙ্ঘন না হলেও এসব ব্যয় নজিরবিহীন ও নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে জেলা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পিকনিকের বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত অনুদান
নথি অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম তার নিজস্ব ২৪তম বিসিএস প্রশাসন অ্যাসোসিয়েশনের গ্র্যান্ড পুনর্মিলনী ও পিকনিক উপলক্ষে দুই দফায় বিজ্ঞাপন বাবদ চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে ২ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। রংপুরে কর্মরত শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনার ঝন্টু আলী সরকারকে ব্যক্তিগত অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ টাকা।
এ ছাড়া বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য ৫ লাখ টাকা, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে আরও ৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। তবে বিজয় দিবসের জন্য দেওয়া ৫ লাখ টাকা কার কাছে গিয়েছে, নথিতে তার উল্লেখ নেই।
ঢাকা বিয়াম ফাউন্ডেশনে এসি বিস্ফোরণে হতাহতদের সহায়তায় ৩ লাখ টাকা, বিভাগীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন বাবদ ৫০ হাজার টাকা, এইচএল ফাউন্ডেশন ফর সোশ্যাল এক্সিলেন্সকে বিজ্ঞাপন বাবদ ১ লাখ টাকা এবং ডিসি পার্কে রং করায় ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫০৫ টাকা।
‘বাঘের খাবার বাইরে যাচ্ছে’
চিড়িয়াখানার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই তহবিল আগে কখনো বাইরে খরচ হতো না। পুরো অর্থ প্রাণী সংগ্রহ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। সাবেক ডিসি মোমিনুর রহমানের সময় থেকে অনুদানের নামে তহবিল থেকে টাকা দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়। এখন জাতীয় দিবসের বাইরে ব্যক্তিগত পছন্দের খাতেও অর্থ যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে চিড়িয়াখানার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এফডিআর
তহবিল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ২ কোটি টাকার মেয়াদি আমানত করেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অর্থপাচারের অভিযোগে আলোচিত ব্যবসায়ী মাহতাবুর রহমান নাসিরের নেতৃত্বাধীন সংকটাপন্ন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে রাখা হয়েছে ১ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংকটে থাকা এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক চিড়িয়াখানার এফডিআরের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠিও দিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।
ডিসি যা বলেছিলেন
অভিযোগ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক থাকাকালে ফরিদা খানম বলেন, ‘চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে অনুদান দেওয়ার অধিকার আমার আছে। আমি কখনও অনৈতিক কিছু করিনি। রংপুরে এক সহকারী কমিশনার মারা যাওয়ায় তার পরিবারকে ১ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছি। অন্যান্য খরচ বিজ্ঞাপন ও অনুদান খাতে হয়েছে। এর বাইরে কিছু হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’
সিপি




