বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের এস আলম-সংযোগ, নেপথ্যে লাবুর ইনটেক কানেকশন
নিয়োগের আগে-পরে শেয়ারে রহস্যময় উত্থান
চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা এক স্পনসর শেয়ারহোল্ডারই এখন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ ঘোষণার ঠিক আগে ও পরে ওই সংযোগযুক্ত একটি ক্ষুদ্র ও লোকসানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থান দেখা গেছে। তথ্য ও করপোরেট নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন গভর্নরের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক যোগসূত্র রয়েছে। এমনকি তার নিয়োগের খবরের ঠিক আগে-পরে একটি লোকসানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরে দেখা গেছে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন। শুধু তাই নয়, গভর্নরের স্ত্রী আখতার সানজিদা কাসেমের সঙ্গেও এস আলমের বাণিজ্যিক যোগসূত্র মিলেছে।

অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে বিদায় করে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি গভর্নর পদে বসানো হয় মোস্তাকুর রহমানকে। তিনি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত; বিএনপির ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁ থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি।
সুইডেনভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্রনিউজে নাজমুল আহসান ও আকিব মো. সাতিলের এক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, গভর্নর নিয়োগের ছায়ায় এস আলম সংযোগ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে রহস্যময় উত্থানের বিবরণ।
নিয়োগের আগে-পরে রহস্যময় উত্থান
তথ্য ও করপোরেট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মোস্তাকুর রহমান অন্তত ২০১০ সাল থেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান ‘ইনটেক লিমিটেড’-এর একজন স্পনসর শেয়ারহোল্ডার। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তার নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ঠিক এক দিন আগে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকায় দাঁড়ায়। নিয়োগের এক দিন পর তা আরও বেড়ে ৩৮ দশমিক ৮ টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনে শেয়ারটির দাম বাড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ।
মজার বিষয় হলো, ইনটেক বর্তমানে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় ছিল মাত্র ১৯ লাখ টাকা, যেখানে নিট লোকসান হয়েছে ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি। কোনো সংগত কারণ ছাড়াই এমন দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারের দাম বাড়ায় বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
এস আলম পরিবারের ছায়া ও ইনটেক
অনুসন্ধানে নেত্রনিউজ জেনেছে, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ইনটেক লিমিটেড’ এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম লাবুর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লাবু হলেন এস আলম গ্রুপের মালিক বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সিঙ্গাপুর ও সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব নেওয়া সাইফুল আলম মাসুদের ছোট ভাই। ইনটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান আতিকুল আলম চৌধুরী হলেন লাবুর ছেলে। নথিতে লাবুকে এই কোম্পানির ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লাবুর ছেলে আতিকুল আলম চৌধুরীর স্ত্রী হলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের মেয়ে জেবা জামান চৌধুরী। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের বিয়ে হয়।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের আগে এস আলম গ্রুপ আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে। তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছিলেন। এখন সেই এস আলম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একজন স্পনসর শেয়ারহোল্ডারকে গভর্নর করায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটি জোরালো হয়েছে।
শেয়ারহোল্ডারদের জটিল যোগসূত্র
ইনটেকের সঙ্গে এস আলম–সংযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্ক বিস্তৃত। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক এএনএম ইয়াহিয়া ও আহমেদুল হক ২০২১ সালে কোম্পানিটির শেয়ার নেন। একই বছর ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে ইনটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বদিউর রহমানের স্ত্রীও শেয়ার কেনেন। যদিও সে সময় এস আলম গ্রুপ ইনটেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে।
নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের স্ত্রী আখতার সানজিদা কাসেম একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ‘এ কাসেম অ্যান্ড কো.’-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালে যখন এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তাদের অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠান ‘ইওয়াই বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে এই ফার্মকে অডিট কাজের জন্য নিয়োগ দেয়। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যাংকগুলোয় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার (৮ বিলিয়ন ডলার) দায় সঞ্চিত হয়। যদিও সানজিদা কাসেমের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি, তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের পরিবারের সঙ্গে এস আলমের এমন বাণিজ্যিক যোগসূত্রকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
পরিচালনা পর্ষদের বয়ান ও ‘নিষ্ক্রিয়’ ভূমিকা
নেত্রনিউজের অনুসন্ধানে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের পরিচয় নিয়ে ইনটেক কর্তৃপক্ষের মধ্যে ধোঁয়াশা দেখা গেছে। কোম্পানি সচিব জাইদুল ইসলাম প্রথমে গভর্নরের পরিচয় অস্বীকার করলেও পরে জানান, তিনি ওই শেয়ারহোল্ডারকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তবে ইনটেকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক এটিএম মাহবুবুল আলম নিশ্চিত করেছেন যে, স্পনসর শেয়ারহোল্ডারই বর্তমান গভর্নর এবং তিনি তার ‘পারিবারিক বন্ধু’। মাহবুবুল আলমের মতে, মোস্তাকুর রহমানের শেয়ার অংশ নগণ্য, মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের কিছু বেশি। ২০১০-এর শুরুতে তিনি সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
অন্যদিকে ইনটেকের পরিচালক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক উবাইদা আসাদী জানান, তিনি গভর্নরকে চেনেন না। আসাদীর বাবা লিয়াকত আলী চৌধুরী চট্টগ্রামে একটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের তদারকি করেন এবং এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-আরাফাহ ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।
ইনটেক ও এর কয়েকজন পরিচালক একাধিকবার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরিমানার মুখে পড়েছেন। তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত হয়েও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করায় কোম্পানিটি নজরদারিতে আসে।
৮৯ কোটি টাকার ঋণ ও স্বার্থের সংঘাত
মোস্তাকুর রহমান একটি মাঝারি আকারের সোয়েটার কারখানার মালিক। বিজিএমইএর মাধ্যমে তিনি এমন এক কমিটিতে ছিলেন, যা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করতো। গভর্নরের নিয়োগের কয়েক মাস আগে গত ডিসেম্বরেই তার মালিকানাধীন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ৮৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনে পুনঃ তফসিল করে বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ঋণসুবিধা অনুমোদন করেন। নতুন গভর্নরের একটি ট্যুর অপারেটিং কোম্পানি ও একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে অংশীদারিত্ব রয়েছে। তার প্রায় সব ব্যবসায়িক স্বার্থই বিনিময় হার বা সুদের হারের সঙ্গে সংবেদনশীল, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্বের আওতায়।
অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান নেত্রনিউজকে বলেন, সরাসরি নিজের বা সহযোগীদের স্বার্থ জড়িত এমন সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে বিরত রাখার মাধ্যমে গভর্নর নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। তবে তাঁর মতে, বড় চ্যালেঞ্জ কাঠামোগত। তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী কম সুদের হারকে ব্যবসার জন্য ভালো মনে করতে পারেন, কিন্তু তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সব সময় উপকারী নাও হতে পারে। রপ্তানিকারকেরা দুর্বল মুদ্রা পছন্দ করেন, যাতে রপ্তানি বাড়ে, কিন্তু তাতে আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, আর বাংলাদেশ আমদানিই বেশি করে।
রাজনৈতিক সংযোগ
নেত্রনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রচারণায় বিএনপির কার্যালয়ে তার নিয়মিত উপস্থিতি ছিল বলে একাধিক দলীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন। তাদের একজন বলেন, তিনি জ্যেষ্ঠ নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং নজরুল ইসলাম খান ও ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে তাকে প্রায়ই দেখা যেত। এই দুজন বর্তমানে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা।
নেত্রনিউজ এসব বিষয়ে মন্তব্যের জন্য গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দুই দিনের সময়সীমার মধ্যেও কোনো জবাব দেননি। পরে তিনি এক সপ্তাহ সময় চাইলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিপি




